পৃথিবীর বয়স মাত্র কয়েক হাজার বছর—একসময় এমন বিশ্বাসই ছিল প্রচলিত। কিন্তু স্কটল্যান্ডের একটি নির্জন উপকূলীয় শিলাস্তর সেই ধারণাকে আমূল বদলে দেয়। সেখানেই প্রায় আড়াই শতাব্দী আগে স্কটিশ ভূতত্ত্ববিদ জেমস হাটন এমন প্রমাণ খুঁজে পান, যা দেখিয়ে দেয় পৃথিবীর ইতিহাস মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক দীর্ঘ।
হাটনের ৩০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্কটল্যান্ডের বেরউইকশায়ারের উপকূলে এখন দর্শনার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘ডিপ টাইম ট্রেইল’ নামে প্রায় এক মাইল দীর্ঘ একটি হাঁটার পথ। এই ট্রেইল পর্যটকদের নিয়ে যায় ঐতিহাসিক সিকার পয়েন্টে, যেখানে দাঁড়িয়ে হাটন পৃথিবীর বয়স ও ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন সম্পর্কে তাঁর যুগান্তকারী তত্ত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পেয়েছিলেন।
বিবিসির এক ভ্রমণধর্মী প্রতিবেদনে স্কটিশ লেখক ও সাংবাদিক স্টুয়ার্ট কেনি সিকার পয়েন্ট ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান নয়, বরং মানবসভ্যতার বৈজ্ঞানিক চিন্তার ইতিহাসে এক মাইলফলক।
আধুনিক ভূতত্ত্বের জনক জেমস হাটন
১৭২৬ সালে এডিনবরায় জন্ম নেওয়া জেমস হাটনকে আধুনিক ভূতত্ত্বের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ১৭৯৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
১৮শ শতকে যখন অধিকাংশ মানুষ বাইবেলভিত্তিক ধারণা অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স কয়েক হাজার বছর বলে বিশ্বাস করতেন, তখন হাটন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা তুলে ধরেন।
তাঁর মতে, পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ একদিনে বা স্বল্প সময়ে তৈরি হয়নি। বরং কোটি কোটি বছর ধরে ক্ষয়, সঞ্চয়ন, উত্তোলন এবং পুনর্গঠনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান পৃথিবী গড়ে উঠেছে।
পরবর্তীকালে এই ধারণাই আধুনিক ভূতত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সিকার পয়েন্ট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
সিকার পয়েন্টে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন ‘হাটনস আনকনফরমিটি’ (Hutton's Unconformity)।
এখানে দেখা যায়, প্রায় উল্লম্বভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অতি প্রাচীন গ্রেওয়াকি শিলার ওপর অপেক্ষাকৃত অনেক নবীন লাল বেলেপাথরের সমতল স্তর জমে আছে।
এই দুই ধরনের শিলার মধ্যকার বিশাল সময়ের ব্যবধানই হাটনকে বুঝতে সাহায্য করে যে পৃথিবীর ইতিহাস মানুষের ধারণার তুলনায় অসীম দীর্ঘ।
তৎকালীন প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০৪ সালে। কিন্তু সিকার পয়েন্টে দাঁড়িয়ে হাটন উপলব্ধি করেন, এমন বিশাল ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন কয়েক হাজার বছরে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কোটি কোটি বছর।
আজ এই দীর্ঘ সময়কালকেই বিজ্ঞানীরা ‘ডিপ টাইম’ নামে অভিহিত করেন।
নতুন ‘ডিপ টাইম ট্রেইল’
জেমস হাটনের স্মৃতিকে সামনে রেখে তৈরি করা ডিপ টাইম ট্রেইল শুরু হয়েছে পিজ বে–এর কাছ থেকে।
প্রায় এক ঘণ্টার সহজ এই হাঁটার পথে রয়েছে—
হাটনের উদ্ধৃতি খোদাই করা পাথর,
ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাসংবলিত তথ্যফলক,
বিশেষজ্ঞদের অডিও বর্ণনা,
এবং শেষ প্রান্তে একটি দর্শনমঞ্চ, যেখান থেকে বিখ্যাত শিলাস্তরটি স্পষ্ট দেখা যায়।
ট্রেইলের শুরুতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানান বিজ্ঞানী ও লেখক ড. এলসা পানচিরোলি। তাঁর কণ্ঠে হাটনের জীবন, গবেষণা এবং সিকার পয়েন্টের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
পথে দেখা মেলে ইতিহাসের সাক্ষী সেন্ট হেলেনস কার্ক
ট্রেইল ধরে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়ে সেন্ট হেলেনস কার্ক নামে একটি পুরোনো গির্জা।
হাটন যখন ১৭৮৮ সালে প্রথম এখানে আসেন, তখনও লাল বেলেপাথরে নির্মিত গির্জাটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় ছিল।
গির্জাটির চারপাশে রয়েছে গ্রেওয়াকি দিয়ে তৈরি প্রাচীন পাথরের দেয়াল বা ডাইক, যা পুরো উপকূলজুড়েই দেখা যায়।
এরপর একটি খাঁজকাটা পাথুরে পথ দর্শনার্থীদের একটি বেঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে যায়। সেখান থেকে স্কটল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের সবুজ পাহাড়, কৃষিজমি, খাড়া পাহাড়ি ঢাল, সোনালি সৈকত এবং উত্তর সাগরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিপ্লবী তত্ত্ব
হাটনের গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পর্যবেক্ষণনির্ভর পদ্ধতি।
তিনি তাঁর দুটি খামারকে পরীক্ষাগারে পরিণত করেছিলেন এবং বছরের পর বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন কীভাবে মাটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়, আবার নতুনভাবে জমা হয়ে নতুন ভূমি তৈরি করে।
এ ছাড়া তিনি স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করেন।
আইল অব অ্যারান এবং জেডবার্গ এলাকাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক বৈসাদৃশ্যের সন্ধান পেয়েছিলেন। তবে তাঁর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে সিকার পয়েন্ট।
শিলার স্তরই জানিয়ে দিল কোটি বছরের ইতিহাস
ডিপ টাইম ট্রেইলের শেষ প্রান্তে রয়েছে একটি অর্ধবৃত্তাকার দর্শনমঞ্চ।
সেখান থেকে নিচের শিলার দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়, গাঢ় রঙের প্রাচীন গ্রেওয়াকি প্রায় উল্লম্বভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার ওপর সমতলভাবে স্তরে স্তরে জমে রয়েছে লাল বেলেপাথর।
হাটন বুঝতে পারেন, প্রাচীন শিলাগুলো প্রথমে সমুদ্রতলে অনুভূমিকভাবে তৈরি হয়েছিল। পরে ভূত্বকের আন্দোলনে সেগুলো উপরে উঠে কাত হয়ে যায়, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং আরও বহু পরে নতুন বেলেপাথরের স্তর তার ওপর জমা পড়ে।
এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যে সময় লেগেছে, তা কয়েক হাজার বছর নয়, বরং কোটি কোটি বছর।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, নিচের গ্রেওয়াকি শিলাগুলো প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে একটি প্রাচীন মহাসাগরের তলদেশে সৃষ্টি হয়েছিল।
অন্যদিকে ওপরের বেলেপাথর তৈরি হয় প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর পরে, যখন বর্তমান স্কটল্যান্ড নিরক্ষরেখার আরও দক্ষিণে অবস্থান করছিল।
সাধারণ মানুষের জন্য ভূতত্ত্বকে সহজ করে তোলার উদ্যোগ
নতুন ডিপ টাইম ট্রেইলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সিকার পয়েন্টকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও পরিচিত করে তোলা।
দীর্ঘদিন ধরে এটি বিশ্বের ভূতত্ত্ববিদদের কাছে এক ধরনের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত হলেও সাধারণ পর্যটকদের কাছে স্থানটি প্রায় অজানাই ছিল।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য হান্টেরিয়ান জাদুঘরের ভূতত্ত্ব বিভাগের কিউরেটর কেটি স্ট্র্যাং বলেন, তিনি নিজে কাছাকাছি এলাকায় বড় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে কখনো সিকার পয়েন্টের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতেন না।
তাঁর আশা, নতুন ট্রেইলটি এমন মানুষদেরও আকৃষ্ট করবে, যাঁরা আগে কখনো ভূতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না।
যেখানে দাঁড়িয়ে বদলে যায় পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি
স্টুয়ার্ট কেনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে লিখেছেন, সিকার পয়েন্টে দাঁড়িয়ে তিনি যেন কোটি কোটি বছরের ইতিহাসের সামনে নিজেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র বলে অনুভব করেছেন।
তাঁর ভাষায়, কয়েক শ কোটি বছরের পুরোনো শিলার ওপর দাঁড়িয়ে সহজেই উপলব্ধি করা যায় কেন এই স্থান পৃথিবীর ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অন্যতম বড় বিপ্লবের সূচনা করেছিল।
জেমস হাটন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘থিওরি অব দ্য আর্থ’–এর উপসংহারে এই ভূদৃশ্য সম্পর্কে লিখেছিলেন—
“সেখানে শুরুর কোনো চিহ্ন নেই, শেষেরও কোনো সম্ভাবনা নেই।”
এই একটি বাক্যই তাঁর বৈপ্লবিক ধারণার সারাংশ তুলে ধরে—পৃথিবী একটি চলমান, ক্রমাগত পরিবর্তনশীল গ্রহ, যার ইতিহাস মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক গভীর ও দীর্ঘ।