ঢাকা

হং ওয়াংয়ের হাতে ফিল্ডস মেডেল, ৯০ বছরের ইতিহাসে তৃতীয় নারী বিজয়ী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
গণিতের জগতে সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে পরিচিত ফিল্ডস মেডেল। প্রায়ই একে ‘গণিতের নোবেল’ বলা হয়। ১৯৩৬ সালে যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ ৯০ বছরের ইতিহাসে এই পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র তিনজন নারী। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো নতুন একটি নাম—চীনা গণিতবিদ হং ওয়াং।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে (International Congress of Mathematicians–ICM) বিশ্বের সেরা চার তরুণ গণিতবিদের একজন হিসেবে ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন ৩৫ বছর বয়সী হং ওয়াং। এর মাধ্যমে তিনি ফিল্ডস মেডেলের ইতিহাসে তৃতীয় নারী এবং প্রথম চীনা নারী হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করলেন।

অল্প বয়সেই গণিতে অসাধারণ যাত্রা

হং ওয়াং ১৯৯১ সালে চীনে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই গণিতে অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিকিং ইউনিভার্সিটির গণিত বিভাগে ভর্তি হন।

স্নাতক শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় (NYU) এবং ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব হাইয়ার সায়েন্টিফিক স্টাডিজ (IHES)-এ অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

যে গবেষণা এনে দিল সর্বোচ্চ স্বীকৃতি

হং ওয়াংয়ের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হারমনিক অ্যানালাইসিস এবং জ্যামিতিক পরিমাপ তত্ত্ব (Geometric Measure Theory)।

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য হলো প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে গণিতবিদদের কাছে অমীমাংসিত থাকা ত্রিমাত্রিক কাকেয়া অনুমান (Kakeya Conjecture)-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান।

সহজভাবে বলতে গেলে, এই সমস্যাটি অনুসন্ধান করে—ত্রিমাত্রিক স্থানে একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের সরলরেখা বা সূচকে সব সম্ভাব্য দিকে ঘোরানোর জন্য সর্বনিম্ন কতটুকু জায়গা প্রয়োজন। বিষয়টি দেখতে সহজ মনে হলেও এটি আধুনিক জ্যামিতি, বিশ্লেষণ এবং গণিতের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জটিল সমস্যা।

হং ওয়াংয়ের গবেষণা শুধু এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের পথই উন্মুক্ত করেনি, বরং হারমনিক অ্যানালাইসিস ও জ্যামিতিক পরিমাপ তত্ত্বে নতুন গবেষণারও দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ফিল্ডস মেডেল প্রদান করা হয়েছে।

কী এই ফিল্ডস মেডেল?

ফিল্ডস মেডেলের নামকরণ করা হয়েছে কানাডীয় গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের নামে। আন্তর্জাতিক গণিত সম্প্রদায়কে একত্রিত করার লক্ষ্যে ১৯২০-এর দশকে তিনি এই পুরস্কার চালুর উদ্যোগ নেন।

নোবেল পুরস্কারের মতো প্রতিবছর নয়, প্রতি চার বছর পর আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে এই পদক প্রদান করা হয়।

এ পুরস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, মনোনীত গণিতবিদের বয়স অবশ্যই ৪০ বছরের কম হতে হবে। তাই এটি শুধু আজীবন অবদানের স্বীকৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতে আরও বড় অবদানের সম্ভাবনাসম্পন্ন তরুণ গণিতবিদদেরও সম্মানিত করে।

ইতিহাসে মাত্র তিন নারী বিজয়ী

ফিল্ডস মেডেলের প্রায় নয় দশকের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মোট ৬৮ জন গণিতবিদ এই সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী মাত্র তিনজন।

তাঁরা হলেন—

মরিয়ম মির্জাখানি (ইরান) — ২০১৪ সালে প্রথম নারী হিসেবে ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন।
মেরিনা ভিয়াজোভস্কা (ইউক্রেন) — ২০২২ সালে দ্বিতীয় নারী বিজয়ী হন।
হং ওয়াং (চীন) — ২০২৬ সালে তৃতীয় নারী এবং প্রথম চীনা নারী হিসেবে এই সম্মাননা লাভ করেন।
নারীদের সাফল্যে নতুন মাইলফলক

দীর্ঘদিন ধরে গণিতের উচ্চপর্যায়ের গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। মরিয়ম মির্জাখানি, মেরিনা ভিয়াজোভস্কা এবং সর্বশেষ হং ওয়াংয়ের অর্জন প্রমাণ করছে যে, আধুনিক গণিতের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানেও নারীরা সমান দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন।

হং ওয়াংয়ের এই ঐতিহাসিক অর্জন শুধু চীনের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে গণিতচর্চায় আগ্রহী তরুণ গবেষক, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থী ও গণিতবিদদের জন্য এক অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে। তাঁর সাফল্য আবারও দেখিয়ে দিল, অধ্যবসায়, গবেষণা এবং সৃজনশীল চিন্তাশক্তির মাধ্যমে গণিতের সবচেয়ে কঠিন রহস্যও উন্মোচন করা সম্ভব।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স