সরকারি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, নিরপেক্ষ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও বিএনপি এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়োগ দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘এভাবে চলতে থাকলে সবার আগে বাংলাদেশ হবে না, সবার আগে হবে বিএনপি।’
সোমবার সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গা জেলা এনসিপির উদ্যোগে আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনসিপির চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি খাজা আমিরুল বাশার।
‘নিরপেক্ষ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি’
আখতার হোসেন বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিতে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ।
তিনি দাবি করেন, দেশের অন্তত ১২টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পরিচালনা করা না গেলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দুর্বল হবে এবং জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে’
আখতার হোসেন বলেন, দেশে প্রকৃত অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন জরুরি।
তাঁর দাবি, গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশে নতুন কাঠামোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিভিত্তিক দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এখন আর গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
শেখ হাসিনার আমলের প্রসঙ্গ
বক্তব্যে আখতার হোসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের সমালোচনাও করেন।
তিনি বলেন, সেই সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত ছিল এবং কথা বললেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে মানুষকে দীর্ঘ সময় কারাবন্দী রাখা হতো। তাঁর অভিযোগ, সরকারের সমালোচকদের গুম করে গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
আখতার বলেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে দেশের লাখো মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, চুয়াডাঙ্গার শাহরিয়ার শুভসহ অনেকেই জীবন দিয়েছেন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশের পথ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন নিয়েও অভিযোগ
আখতার হোসেন বলেন, তাঁরা এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা প্রত্যাশা করেছিলেন যেখানে কারচুপির সুযোগ থাকবে না এবং নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে।
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, বর্তমান নির্বাচন কমিশনে একজন দলীয় কর্মীকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রভাব বিস্তার করা যায়।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
কর্মসংস্থান সংকট নিয়ে উদ্বেগ
দেশে তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির সদস্যসচিব।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের মতো মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ দিনের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি পদের বিপরীতে প্রায় ২০ জন আবেদন করছেন। তাঁর মতে, এটি দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ না দিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে যোগ্য ও মেধাবী তরুণরা স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চাকরি পেতে পারেন।
একই সঙ্গে তিনি জানান, জনগণের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এনসিপি সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে।
হাসনাত আবদুল্লাহরও বিএনপির সমালোচনা
পথসভায় বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নির্বাচনী অনিয়মের সমালোচনা করে বলেন, অতীতে জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল। পাশাপাশি তাঁর অভিযোগ, বর্তমান বিএনপি সরকারও ভবিষ্যতের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ
সাংবাদিকদের উদ্দেশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানাগত প্রভাবের কারণে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না।
তিনি আরও বলেন, এনসিপি স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের পক্ষে থাকলেও বিএনপি সরকার সে উদ্যোগ বাস্তবায়নে আগ্রহী নয় বলে তাঁদের ধারণা।
জেলা পরিষদ ও কর্মসংস্থান নিয়েও অভিযোগ
হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, জনগণ যাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে, তাঁদেরই জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বিএনপি সরকার এক বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে মাদকের বিস্তার রোধে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
পথসভায় উপস্থিত নেতারা
চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় মাথাভাঙ্গা পুরাতন সেতুর ওপর অনুষ্ঠিত পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, নারীশক্তির সদস্যসচিব ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতু, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসানসহ জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অন্যান্য নেতারা।
উল্লেখ্য, পথসভায় আখতার হোসেন ও হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।