সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করার প্রশ্নে ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, যদি আগের মতোই প্রধানমন্ত্রীর হাতে অসীম ক্ষমতা বহাল থাকে, তাহলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে এত প্রাণহানি ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন কী ছিল। তাঁর দাবি, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে আন্দোলন হয়েছিল, তার চেতনার সঙ্গে বর্তমান অবস্থান সাংঘর্ষিক।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: স্বাস্থ্য খাতের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করে চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)।
‘আগের মতো ক্ষমতা থাকলে বিপ্লবের প্রয়োজন কী ছিল’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যদি সংবিধানে আগের মতোই প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ধরনের নির্বাহী ও সাংবিধানিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত জারি করেন, তাহলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘যদি আগের মতোই সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা থাকে, তিনি যা বলবেন রাষ্ট্রপতি তাই প্রজ্ঞাপন জারি করবেন, তাহলে জুলাইয়ে এত রক্ত, এত বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল কেন? বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই তো সেই আন্দোলন হয়েছিল।’
বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা
ঐকমত্য কমিশনের বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, কমিশন সুপারিশ করেছিল যে প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের প্রধান থাকতে পারবেন না। কিন্তু এ প্রস্তাবে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষমতা একটি স্বাধীন কমিটির হাতে দেওয়ারও সুপারিশ করেছিল কমিশন। কিন্তু সেই প্রস্তাবেও বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, বিএনপি সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রাখতে চায়, যা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে’
বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে এসেছে এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে।
তাঁর মতে, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কারসমর্থিত রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় গিয়ে যদি গণভোটের রায় অস্বীকার করা হয়, তাহলে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে না।’
সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনার আহ্বান
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার কথা। সেই সময়সীমাও সেপ্টেম্বরে শেষ হবে।
তাঁর মতে, আগামী সংসদ অধিবেশনে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অর্থবহ আলোচনা হতে পারে।
‘সরকার সংস্কার–আতঙ্কে ভুগছে’
সেমিনারে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে কেবল সংশোধনের কথা বলছে। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের আন্দোলন কেবল সীমিত সংশোধনের জন্য হয়নি; জনগণ একটি মৌলিক সংস্কার চেয়েছিল।
শফিকুল ইসলাম মাসুদের ভাষ্য, সরকার গণভোটের রায়ের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছে না এবং শেষ পর্যন্ত জনগণই সেই রায় বাস্তবায়ন করবে।
চিকিৎসকদের অবদানের কথা স্মরণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় চিকিৎসকদের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে যখন অনেকে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ছিলেন, তখন চিকিৎসকেরা আহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের এই অবদান জাতি সব সময় স্মরণ রাখবে।
শহীদ পরিবারের বিচারপ্রাপ্তির দাবি
সেমিনারে বক্তব্য দেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নিহত চিকিৎসক ডা. সজীব সরকারের ছোট বোন সুমাইয়া সরকার।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দুই বছর পার হলেও তাঁর ভাই হত্যার বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। শুধু তাঁদের পরিবার নয়, আন্দোলনে নিহত আরও অনেক শহীদ পরিবারের সদস্য এখনো বিচারপ্রাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।
চিকিৎসকদের বদলি নিয়ে অভিযোগ
চিকিৎসক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর যেসব চিকিৎসক আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেককে বেছে বেছে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে বদলি করা হচ্ছে।
তিনি এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়া উচিত নয়।
প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও অন্যান্য বক্তা
সেমিনারে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় চিকিৎসকদের ভূমিকার ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনডিএফের নেতা মোহাম্মদ সুজন শরীফ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি এমজি ফারুক হোসেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম, এনডিএফের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজেদ আবদুল খালেক, অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম এবং ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসীম উদ্দিনসহ অন্যরা।