বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ডে অতীতের ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ আচরণেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, সরকার গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে এসে একই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণ করছে।
রোববার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জান দিব, জুলাই দিব না’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ লেবার পার্টি এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
‘নতুন কিছু দেখছি না’
সরকারের কঠোর সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কিছু দেখা যাচ্ছে না; বরং অতীতের শাসনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবিই ফুটে উঠছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা তো নতুন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তখনকার ফ্যাসিস্টরা যা করেছে, হুবহু তার একটি ফটোকপি আমরা আপনাদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, যারা একসময় নিজেদের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাঁরাই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে গেছেন।
তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা নিজেরাই বলেছেন, তাঁরা ধানখেতে, পাটখেতে ছিলেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সেই স্মৃতি তাঁরা ভুলে গেলেন। যে স্বভাব ফ্যাসিস্ট সরকারের ছিল, সেটি এখন তাঁরা ধারণ করছেন।’
নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
জামায়াতের আমির অভিযোগ করেন, বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মীকে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
‘জনগণের রায় অগ্রাহ্য করলে পরিণতি ভালো হয় না’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের মতামত ও আকাঙ্ক্ষাকে যারা গুরুত্ব দেয় না, শেষ পর্যন্ত জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করে।
তিনি বলেন, ‘জনগণের অভিপ্রায়কে যারা সম্মান করে না, জনগণ তাদের অন্তর থেকে প্রত্যাখ্যান করে। এতে অনেকে শেষ পর্যন্ত দেশেও থাকতে পারে না, দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।’
হবিগঞ্জে হামলার ঘটনায় নিন্দা
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আলিফ হোসেনের ওপর হামলার ঘটনারও তীব্র নিন্দা জানান জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ‘চোখ তো শেষ করেছিল শেখ হাসিনা, আপনারা আবার শুরু করলেন কেন? পারবেন চোখটা ফিরিয়ে দিতে? পারবেন না।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার সময় জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আলিফ হোসেন চোখে গুরুতর আঘাত পান।
‘সচিব হতে এখন দলীয় পদই যথেষ্ট’
সরকারের নিয়োগনীতি নিয়েও সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি অন্য রাজনৈতিক দল থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া একজন নেতাকে সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘একজন তো প্রমোশন পাইতে পাইতে সচিব হয়ে গেছে। সচিব হওয়ার জন্য এখন আর বিসিএস কোয়ালিফাই করা লাগবে না। সচিব হওয়ার জন্য দলীয় একটা পদ থাকলেই হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন।
‘মতলববাজদের বিষয়ে সতর্ক থাকুন’
বক্তব্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সতর্ক করে জামায়াত আমির বলেন, সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিদের আশ্রয় দিলে একসময় তার নেতিবাচক পরিণতি ভোগ করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘মনে রাখবেন, দুধকলা দিয়ে যদি কালসাপ পোষেন, একদিন সেই সাপের ছোবলে আপনার জীবনও যেতে পারে। এরা কারও নয়, এরা মতলববাজ। এরা সমাজকে ডোবায়, নিজেরাও ডোবে।’
‘ব্যক্তিকে নয়, যুক্তিকে আঘাত করুন’
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ব্যক্তি ও দায়িত্বকে এক করে দেখা ঠিক নয়। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা গণতন্ত্রের অংশ, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ পরিহার করা উচিত।
তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকতে চাইলে সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতাও থাকতে হবে।
অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান) বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা একই সূত্রে গাঁথা। বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দুটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের জন্ম হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানান।
আলোচনা সভার প্রধান আলোচক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশপাশে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও ভারতের গবেষণা ও বিশ্লেষণ সংস্থা (র)-এর এজেন্ট রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে দেশের মানুষের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, সরকার পরিচালনায় এরই মধ্যে ব্যর্থতার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দলীয় সন্ত্রাস বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা ছিল, সরকার তা পূরণ করতে পারেনি।
এ ছাড়া সভায় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মূসা বিন ইযহার, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন।