মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) সাম্প্রতিক গণ-অনুপ্রবেশের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে স্পেন। দেশটির সরকার জানিয়েছে, স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত অতিক্রম করে সেউতায় প্রবেশ করা প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসীর অধিকাংশই ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় মরক্কোতে ফিরে যেতে শুরু করেছেন।
তবে এই নজিরবিহীন সীমান্ত সংকটে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৭ জনে পৌঁছেছে। সীমান্ত পার হওয়ার সময় ডুবে যাওয়া, পদদলিত হওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনায় এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্পেন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে মরক্কো অংশে আরও হতাহতের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।
সেউতা উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড। এটি আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসীদের জন্য একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত।
সীমান্তে প্রাণহানি ও সংঘর্ষ
স্পেনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মরক্কো ও সেউতার মধ্যবর্তী সীমান্তপ্রাচীর এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ টপকে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় অনেক অভিবাসী সাগরে ডুবে যান বা পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান।
মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় কয়েকটি বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন সীমান্তে সামরিক যান ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটের মুখে অনেক অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যাচ্ছেন।
ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
সেউতায় কয়েক হাজার মানুষের একযোগে প্রবেশ ইউরোপীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এটিকে ‘স্পেনের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন। তবে ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক দল স্পেন সরকারের অভিবাসন নীতিকে দায়ী করে সমালোচনা করেছে।
তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সাধারণ ক্ষমা (অ্যামনেস্টি) এবং তুলনামূলক নমনীয় অভিবাসন নীতি অভিবাসীদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় উৎসাহিত করেছে।
এদিকে ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে সীমান্তহীন শেনজেন ব্যবস্থা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও মাদ্রিদ এ সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্পেনের অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
কী কারণে ঘটল এই গণ-অনুপ্রবেশ?
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই অভিবাসী সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে মরক্কোর দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গুজব।
মরক্কোয় তরুণদের বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশের বেশি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সংকট বহু তরুণকে ইউরোপমুখী হতে উৎসাহিত করছে।
এরই মধ্যে চলতি জুলাইয়ে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে ঘিরে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, সমুদ্রপথে আটক হওয়া অভিবাসীদের আর দ্রুত ফেরত পাঠানো যাবে না।
এই তথ্য বিশ্বাস করে অনেক তরুণ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। তবে স্পেন সরকার পরে স্পষ্ট করে জানায়, আইন অনুযায়ী দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিধান এখনো বহাল রয়েছে।
মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে জল্পনা
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে মরক্কো হয়তো সীমান্তে নজরদারি কিছুটা শিথিল করেছিল।
উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন সেউতা ও মেলিইয়া অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে মরক্কো নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম সাহারা ও আলজেরিয়া ইস্যুতে স্পেনের সাম্প্রতিক অবস্থানে অসন্তুষ্ট হয়ে রাবাত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা দেখিয়ে থাকতে পারে।
তবে মরক্কো ও স্পেন—উভয় দেশের কর্মকর্তাই এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ভাসমান সীমান্ত বেড়া বসাচ্ছে স্পেন
প্রাণঘাতী এই সীমান্ত সংকটের পর ভবিষ্যতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্পেন।
সেউতার তারাজাল সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ ভাসমান বেড়া (ফ্লোটিং ব্যারিয়ার) স্থাপন শুরু করেছে স্প্যানিশ পুলিশ।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার উঁচুতে ভাসমান নিউমেটিক ব্যারিয়ার ও রানিং বয়া বসানো হচ্ছে, যাতে সাঁতরে সীমান্ত অতিক্রম করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে সিভিল গার্ড, সামরিক বাহিনী এবং নৌবাহিনীর টহলও জোরদার করা হয়েছে।
স্পেনের তথ্য অনুযায়ী, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার অভিবাসী মরক্কোয় ফিরে গেছেন।
ইইউর জরুরি বৈঠকের আহ্বান
সেউতা সংকটকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২২টি সদস্যদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন নীতি এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয় জোরদারে ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও এ বিষয়ে দ্রুত আলোচনা আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে ইতালির শেনজেন ব্যবস্থা সাময়িক স্থগিতের সিদ্ধান্তকে তিনি ‘স্বার্থপর ও ইউরোপকে আরও বিভক্ত করার মতো পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সেউতা সংকট এখন শুধু স্পেন ও মরক্কোর সীমান্ত সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইউরোপের অভিবাসন নীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।