যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও ইরানের সামরিক বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে কঠোর পাল্টা হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ইরান ‘দৃঢ় ও সমান প্রতিক্রিয়া’ জানাবে।
শনিবার তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপে তিনি এই বার্তা দেন। একই সময়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নূরনিউজ দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইসরায়েলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
‘যেকোনো আগ্রাসনের জবাব কঠোর হবে’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে আলাপকালে আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেকোনো ‘বেপরোয়া’ বা ‘আগ্রাসী’ পদক্ষেপের জবাবে ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
নিজের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড’ মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেছেন বলেও জানান।
কুয়েতের দাবি, ইরানের ড্রোন ভূপাতিত
আরাগচির এই সতর্কবার্তার কয়েক ঘণ্টা আগে কুয়েতের সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা ইরানের ছোড়া কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
কুয়েতের ভাষ্য, দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব ড্রোন পাঠানো হয়েছিল। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সৌদিকে সতর্কবার্তা
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে আলাপকালে আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলায় যদি আঞ্চলিক কোনো দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়, তাহলে ইরান সেই দেশের বিরুদ্ধেও ‘সমান প্রতিক্রিয়া’ জানাবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুবরাজ ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান।
জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূরনিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোয় হামলা চালায়, তাহলে ইরান পাল্টা হিসেবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্র এবং কাতার ও ইসরায়েলের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালাবে।
নূরনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হবে।’
তবে এ বক্তব্য ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্পের অবস্থান
এর আগের দিন শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তাঁর বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দল এখনো ইরানের সঙ্গে একটি নতুন সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারে।
এই আলোচক দলে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রয়েছেন।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ইরানের প্রতি তাঁর আস্থা কমে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, তেহরান অতীতেও একাধিকবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
পাল্টাপাল্টি অবিশ্বাসে উত্তেজনা
অন্যদিকে ইরানও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার হুমকি বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও একই সঙ্গে সামরিক হুমকি ও কঠোর অবস্থান সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।