ঢাকা

‘হাসিনার ভাষায় কথা বলা শুরু করেছেন বিরোধী নেতারা’—মির্জা ফখরুলের মন্তব্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বর্তমান বিরোধী দলের নেতারা গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ভাষা ব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, বিরোধীদের রাজপথে সংঘাতের পরিবর্তে সংসদে এসে আলোচনা করা উচিত এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কও সংসদীয় প্রক্রিয়াতেই নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘শেখ হাসিনার ভাষার পুনরাবৃত্তি’

মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা যেভাবে বলতেন—‘এক দিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেব না’ কিংবা ‘পাঁচ বছর সরকার চালাতে দেব না’—বর্তমান বিরোধী নেতাদের বক্তব্যেও এখন সেই একই ধরনের ভাষা শোনা যাচ্ছে।

তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সমালোচনা ও বিরোধিতা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় হলেও সেটি সংসদীয় শিষ্টাচারের মধ্যেই হওয়া উচিত। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সংঘাতে রূপ না দিয়ে সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কাজ চলছে

সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলে দাবি করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সংস্কার’ নাকি ‘সংশোধন’—এ ধরনের শব্দগত বিতর্কসহ যেকোনো মতভেদ সংসদেই আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। রাজপথে সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি না করে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান

দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ বছরের শাসনামলে সৃষ্টি হওয়া নানা জটিলতা ও সংকট কাটিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত সরকার গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ করে যাচ্ছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে যে গুঞ্জন বা সমালোচনা করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, দেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ বিএনপিই নিয়েছে এবং বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতায় কাজ করছে।

আইনশৃঙ্খলা ও সংবাদমাধ্যম প্রসঙ্গ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান মির্জা ফখরুল।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কর্মসংস্থান, আবাসন এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্দোলনে নিহত সাংবাদিক ও অন্যান্য শহীদ পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন।

তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান জাতীয় সংসদকেই দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে আবেগ নয়, কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র এবং উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তথ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সম্প্রতি রাজনীতিকে পরিকল্পিতভাবে সংসদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে অশালীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য অপরিহার্য।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখার আহ্বান

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘ স্বৈরশাসন, নির্যাতন ও দুর্নীতির অবসানের পথ তৈরি করেছে। এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বাক্‌স্বাধীনতা, সুশাসন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এবং শিক্ষা-চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।

বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। কেউ যদি জুলাইয়ের চেতনাকে আড়াল করার চেষ্টা করে, জনগণই তার জবাব দেবে।

ডিইউজের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অতীতে শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কিছু গণমাধ্যম আবারও পুরোনো ধারা অনুসরণ করছে। তিনি এ বিষয়ে সাংবাদিক সমাজকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাতির গৌরবের অংশ হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিভাজন নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসী আরা জামান বলেন, গণতন্ত্রে সমালোচনা থাকবে, তবে সেই সমালোচনা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষে পরিণত না হয়।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেলসহ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স