ঢাকা

বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপির অস্বস্তি, দুই রাজ্যে হার, গুজরাটে ভোট কমেছে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের তিনটি রাজ্যের তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনের ফল বিজেপির জন্য নতুন রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে এসেছে। বিহারে দলের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হাতছাড়া হওয়ার মুখে, মধ্যপ্রদেশে প্রত্যাশিত আসন জিততে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা এবং গুজরাটে জয়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দলটির জন্য পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের প্রেক্ষাপটে এই ফলাফলকে বিজেপির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সোমবার বিকেল পর্যন্ত গণনা অনুযায়ী, বিহারের বাঁকিপুর, মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া এবং গুজরাটের মঞ্জলপুর—এই তিনটি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল গুজরাটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। তবে সেখানেও আগের নির্বাচনের তুলনায় জয়ের ব্যবধান অনেক কমে এসেছে।

বাঁকিপুরে বিজেপির দুর্গে প্রশান্ত কিশোরের ঝড়

সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিহারের বাঁকিপুর আসন। এটি দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির অন্যতম নিরাপদ আসন হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে টানা পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতীন নবীন। রাজ্যসভায় যাওয়ার কারণে তাঁর আসনটি শূন্য হলে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।

কিন্তু এবার সেই আসনেই চমক দেখিয়েছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হওয়া জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর, যিনি ‘পিকে’ নামেই বেশি পরিচিত।

বিকেল চারটা পর্যন্ত পাওয়া ফল অনুযায়ী, প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই তিনি প্রায় ১৫ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহার চেয়ে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে চলে যায়। তাদের প্রার্থী রেখা কুমারীর ভোট ছিল মাত্র প্রায় ১১ হাজার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাঁকিপুরের ফল শুধু বিজেপির জন্য ধাক্কাই নয়, বিহারের বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, প্রশান্ত কিশোর শুধু বিজেপির ভোটে ভাগ বসাননি, আরজেডির বিকল্প হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠার আভাস দিয়েছেন।

মধ্যপ্রদেশেও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বিজেপি

মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসন ছিল কংগ্রেসের দখলে। তবে বিজেপি এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পছন্দের প্রার্থীকে সামনে এনে আসনটি দখলের চেষ্টা করে।

কিন্তু ভোট গণনার প্রবণতায় দেখা যায়, কংগ্রেস প্রার্থী ঘনশ্যাম সিং প্রায় ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন বিজেপি প্রার্থী আশুতোষ তিওয়ারির চেয়ে।

২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের রাজেন্দ্র ভারতী এখানে বিজেপির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্রকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ভোটে পরাজিত করেছিলেন। পরে একটি জালিয়াতি মামলায় তিন বছরের সাজা হওয়ায় তাঁর বিধায়ক পদ বাতিল হলে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।

নির্বাচনের আগে বিজেপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও প্রকাশ্যে আসে। নরোত্তম মিশ্র প্রথমে দলীয় প্রার্থী নিয়ে আপত্তি তুললেও পরে প্রচারে অংশ নেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় কোন্দল বিজেপির ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

গুজরাটে জয়, কিন্তু কমেছে ব্যবধান

তিন রাজ্যের মধ্যে বিজেপির একমাত্র স্বস্তির খবর এসেছে গুজরাটের মঞ্জলপুর আসন থেকে। তবে এই জয়ও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।

২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এই আসনে এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল। কিন্তু এবার বিকেল পর্যন্ত তাদের ব্যবধান ছিল মাত্র ২৭ হাজার ভোটের মতো।

স্থানীয় বিধায়কের মৃত্যুর কারণে এই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি আসনটি ধরে রাখতে পারলেও ভোটের ব্যবধান এতটা কমে যাওয়া দলটির জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রভাব কতটা?

এই উপনির্বাচনের অন্যতম আলোচিত দিক ছিল সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব।

দেশজুড়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত শিক্ষার্থী আন্দোলনের উত্থান, তাদের আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত ছাড় এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—এসব ঘটনার পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন।

তাই রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ ছিল, তরুণ ভোটাররা বিজেপির পাশে থাকবে, নাকি বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকবে।

বাঁকিপুরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে অনেকেই মনে করছেন, তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রশান্ত কিশোরের প্রতি সমর্থন দিয়েছে। জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির জন্য পরিচিত বিহারে এই পরিবর্তনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজেপির জন্য রাজনৈতিক বার্তা

বিহারের ফল আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে কেন্দ্রে যাওয়ার পর সম্রাট চৌধুরীর নেতৃত্বে বিজেপির এটি ছিল প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না আসায় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

একই সঙ্গে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র জন্যও এই ফল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিহারে আরজেডিকে ছাড়িয়ে প্রশান্ত কিশোরের উত্থান বিরোধী রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত

তিন রাজ্যের উপনির্বাচনের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিজেপি এখন শুধু ঐতিহ্যগত বিরোধীদের নয়, নতুন রাজনৈতিক শক্তিরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

আগামী দিনে বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন এবং পরবর্তী জাতীয় রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে এই উপনির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিজেপির জন্য এটি যেমন আত্মসমালোচনার উপলক্ষ, তেমনি বিরোধী রাজনীতির জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স