মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে বন্দী অবস্থায় থাকা দেশটির সাবেক রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নেতা অং সান সু চির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির সামরিক সরকার। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ এবং নানা জল্পনার মধ্যে এই ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার মিয়ানমারের সরকারি মুখপাত্র জানান, রাজধানী নেপিডোতে আইসিআরসির আবাসিক প্রতিনিধি আরনো দ্য বেক সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে বৈঠকের সময়, স্থান, আলোচনার বিষয়বস্তু কিংবা সু চির স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে সু চির সাক্ষাতের দাবি সামনে এল। যদিও বৈঠকের স্বাধীন বা নিরপেক্ষ কোনো যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
পাঁচ বছর ধরে অজ্ঞাত অবস্থানে সু চি
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং-এর নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর থেকেই তাঁকে আটক রাখা হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর থেকে সু চিকে কোথায় রাখা হয়েছে, তাঁর স্বাস্থ্য কেমন কিংবা তিনি কী অবস্থায় আছেন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রায় অনুপস্থিত। এ সময়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধির প্রকাশ্য সাক্ষাতের তথ্যও সামনে আসেনি।
এই দীর্ঘ নীরবতার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংগঠন এবং সু চির পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার তাঁর জীবিত থাকা ও শারীরিক অবস্থার প্রমাণ প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
জান্তার ঘোষণার পেছনে কী কারণ
পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সু চির স্বাস্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রেড ক্রস প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকের খবর প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সমালোচনা কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করছে সামরিক সরকার।
বিশেষ করে চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে সেনাবাহিনী-সমর্থিত নির্বাচনের পর সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর কর্তৃপক্ষ জানায়, সু চিকে গোপন কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে।
তবে সেই দাবিরও স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই সম্ভব হয়নি।
প্রকাশিত ছবিও তুলেছিল বিতর্ক
গত ৩০ এপ্রিল মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রথমবারের মতো সু চির একটি ছবি প্রকাশ করে। ছবিতে তাঁকে একটি কাঠের বেঞ্চে বসে সামরিক পোশাক পরা দুই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
কিন্তু ছবিটি প্রকাশের পরপরই এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের দাবি ছিল, একটি স্থিরচিত্র দিয়ে সু চির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
ছেলের দাবি—‘জীবিত থাকার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখান’
ছবি প্রকাশের পর সু চির ছেলে কিম অ্যারিস আবারও মিয়ানমার সরকারের কাছে তাঁর মায়ের জীবিত থাকার স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশের দাবি জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলেও তাঁর মায়ের জীবিত থাকার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, একজন ৮১ বছর বয়সী নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নেত্রীকে এক গোপন স্থান থেকে আরেক গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়াকে স্বাধীনতা বলা যায় না।
কিম অ্যারিসের ভাষায়, তাঁর মা এখনো কার্যত জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন এবং বিশ্ববাসীর সামনে তাঁর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা উচিত।
আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর কৌশল?
বিশ্লেষকদের ধারণা, সামরিক সরকার সু চিকে গৃহবন্দী করা হয়েছে—এমন ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সু চির পরিবারের মতে, অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেই তাঁর স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না।
কিম অ্যারিস অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ আশা করেছিল গৃহবন্দী করার ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিষয়টি নিয়ে আর প্রশ্ন তুলবে না। কিন্তু তাঁর পরিবার এখনো জানতে চাইছে—সু চি কোথায় আছেন, তিনি সুস্থ আছেন কি না এবং তাঁর সঙ্গে স্বাধীনভাবে দেখা করার সুযোগ কবে দেওয়া হবে।
ভারতের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ
সম্প্রতি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে ভারত সরকার যে উষ্ণ ও আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তাতেও হতাশা প্রকাশ করেছেন কিম অ্যারিস।
তিনি বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের প্রতি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
সাজা কমলেও মুক্তি মেলেনি
সামরিক সরকার দুর্নীতি, নির্বাচনী জালিয়াতিতে উসকানি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনসহ একাধিক মামলায় অং সান সু চিকে মোট ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুতে সাধারণ ক্ষমার আওতায় তাঁর সাজা কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে নির্জন কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে তিনি এখন কোথায় আছেন, কী ধরনের পরিবেশে রাখা হয়েছে কিংবা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুযোগ কতটা রয়েছে—এসব প্রশ্নের কোনো স্বচ্ছ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক মহলের নজর
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অং সান সু চির সঙ্গে রেড ক্রস প্রতিনিধির বৈঠকের সরকারি দাবি সত্য হলে তা দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে পারে। তবে তারা বলছে, একটি বৈঠকের ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর অবস্থান, স্বাস্থ্য ও আইনগত অধিকার সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়মিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত আস্থার পরীক্ষা।
সেই কারণে আইসিআরসির সম্ভাব্য এই সাক্ষাৎকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সু চির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হবে না।