সিনেট নির্বাচনে রেকর্ড অর্থ ব্যয়, ইসরায়েলনীতি ঘিরে ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ অবস্থানেও বাড়ছে গুরুত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারি নির্বাচন শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি এখন মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলনীতি, নির্বাচনী অর্থায়ন এবং বিশেষ স্বার্থান্বেষী লবিগুলোর প্রভাব নিয়ে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলপন্থী লবি আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)-এর নজিরবিহীন অর্থ ব্যয় এই নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাইমারিগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের ফলাফল ভবিষ্যতে ডেমোক্রেটিক পার্টির ইসরায়েল-সংক্রান্ত নীতি, কংগ্রেসে প্রগতিশীলদের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী অর্থায়নের চরিত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারে কেন্দ্রবিন্দুতে আইপ্যাক
ডেট্রয়েটের শহরতলি ডিয়ারবোর্নে আবদুল আল-সাইয়েদের এক নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকেরা ‘আইপ্যাক নিপাত যাক’ স্লোগান দেন। সেখানে বক্তারা অভিযোগ করেন, আইপ্যাক বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন প্রার্থীদের পরাজিত করার চেষ্টা করছে, যারা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেন।
মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা আলাবাস ফারহাত বলেন, ভোটাররা যদি আল-সাইয়েদকে নির্বাচিত করেন, তাহলে আইপ্যাকের ব্যয় করা কোটি কোটি ডলার কার্যত ব্যর্থ হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও সাশ্রয়ী আবাসনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থের অভাবের কথা বলা হলেও বিদেশে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই অর্থ ব্যয় করছে।
সমাবেশে কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমরসহ একাধিক প্রগতিশীল নেতা উপস্থিত ছিলেন।
কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়
এই প্রাইমারিতে আবদুল আল-সাইয়েদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চারবারের কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের অবসরের পর শূন্য হওয়া আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রাইমারিতে বিজয়ী প্রার্থী আগামী নভেম্বরে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন।
রেকর্ড অর্থ ব্যয়
ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের (এফইসি) তথ্য অনুযায়ী, হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে এবং আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে আইপ্যাক ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) মিলিয়ে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ‘সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক প্রায়োরিটিজ’ নামে একটি ডার্ক-মানি গ্রুপ আরও প্রায় ৬৫ লাখ ডলার বিজ্ঞাপনে ব্যয় করেছে। ফলে স্টিভেন্সকে সমর্থন করতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৬ কোটি ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইপ্যাক একাই কত ব্যয় করেছে
আইপ্যাকের নির্বাচনী শাখা ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট (ইউডিপি) এই নির্বাচনে ৩ কোটি ৬ লাখ ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।
এটি আইপ্যাকের ইতিহাসে একটি রেকর্ড ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইপ্যাক দীর্ঘদিন ধরেই এমন প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অর্থ ব্যয় করে আসছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সহায়তার বিরোধিতা করেন।
অর্থের উৎস কোথায়
ইউডিপির সবচেয়ে বড় অর্থদাতা আইপ্যাক নিজেই।
চলতি নির্বাচনী চক্রে ইউডিপি প্রায় ১০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে ৩ কোটি ডলার এসেছে আইপ্যাক থেকে।
আইপ্যাক একটি অলাভজনক সামাজিক কল্যাণমূলক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ায় তাদের মূল দাতাদের পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে এই অর্থায়নের বড় অংশকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘ডার্ক মানি’ বলা হয়।
এ ছাড়া ধনী ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন থেকেও ইউডিপি অর্থ পেয়ে থাকে।
আরও যেসব গোষ্ঠী অর্থ ব্যয় করেছে
স্টিভেন্সের পক্ষে ব্যয় করা বাকি অর্থ এসেছে একাধিক পিএসি ও অলাভজনক সংগঠনের মাধ্যমে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- এ স্ট্রংগার মিশিগান—ব্যয় করেছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
- সেন্টার ফরওয়ার্ড—এই গোষ্ঠীর অন্যতম অর্থদাতা।
- মিশিগান ফরওয়ার্ড ২০২৬—ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল লুবেটজকি, আমেরিকান কেমিস্ট্রি কাউন্সিল এবং আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর গুড গভর্ন্যান্সের অর্থায়নে পরিচালিত।
- ইউনাইট টু উইন—স্টিভেন্সের পক্ষে আরও প্রায় ৪০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অর্থায়নের কাঠামো অনেকটা একটির ভেতরে আরেকটি সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় প্রকৃত অর্থদাতাদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরাসরি অনুদানে এগিয়ে আল-সাইয়েদ
বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর স্বাধীন ব্যয়ের বাইরে সরাসরি নির্বাচনী অনুদানে অবশ্য এগিয়ে রয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ।
তাঁর প্রচার তহবিলে এসেছে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যেখানে হ্যালি স্টিভেন্স সংগ্রহ করেছেন প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ে একজন দাতা নির্দিষ্ট সীমার বেশি সরাসরি কোনো প্রার্থীকে অনুদান দিতে পারেন না।
আল-সাইয়েদের পক্ষে কারা
আল-সাইয়েদের পক্ষে স্বাধীনভাবে প্রায় ৩৫ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমর্থক ফাইটিং ফর মিশিগান নামের একটি প্রগতিশীল গোষ্ঠী।
এই সংগঠনটি ‘ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং’সহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনপন্থী দাতা, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং প্রগতিশীল সংগঠনের সহায়তা পেয়েছে।
স্টিভেন্সের অবস্থান
হ্যালি স্টিভেন্স সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর পক্ষে আইপ্যাকের বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে নির্বাচনী অর্থায়ন ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
একটি টেলিভিশন বিতর্কে তিনি বলেন, তাঁর জন্য সুপার পিএসি অর্থ ব্যয় করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য সুপার পিএসি অর্থ ব্যয়ের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য তিনি দেখেন না।
তবে আল-সাইয়েদের সমর্থকেরা পাল্টা দাবি করেন, দুই পক্ষের স্বাধীন ব্যয়ের ব্যবধান ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারেরও বেশি, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আল-সাইয়েদের অভিযোগ
আবদুল আল-সাইয়েদ তাঁর নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবেই আইপ্যাকের অর্থায়নকে তুলে ধরেছেন।
তাঁর ভাষ্য, তিনি মিশিগানের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে চান, আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বড় দাতা ও লবিগোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ।
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোটিপতি, করপোরেশন ও বিশেষ স্বার্থান্বেষী লবিগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।
গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সহায়তার বিষয়টিও তিনি নির্বাচনী বিতর্কে সামনে এনেছেন।
আইপ্যাকের বক্তব্য
আইপ্যাক নিজেদের কোনো বিদেশি সরকারের প্রতিনিধি নয় বলে দাবি করে।
সংস্থাটির ভাষ্য, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অংশীদারত্বে বিশ্বাসী সচেতন আমেরিকানদের একটি জোট।
সমর্থকদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় আইপ্যাক মিশিগানের সিনেট নির্বাচনকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ উল্লেখ করে জানায়, তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখবে এবং নিজেদের মূল্যবোধের বিরোধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিভাজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন স্পষ্ট।
এমন পরিস্থিতিতে আবদুল আল-সাইয়েদ যদি বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জয়ী হন, তাহলে সেটি আইপ্যাকের রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হবে। একই সঙ্গে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ইসরায়েল প্রশ্নে দলের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনাও আরও জোরালো হতে পারে।
অন্যদিকে এই সিনেট আসনের ফলাফল আগামী নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, সেই সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।