বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি নৌপথ নির্ধারণে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ইরান ও ওমান। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি যৌথ কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উপস্থিতি, অবরোধ এবং নিরাপত্তা–সংক্রান্ত উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে নতুন এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তৃতীয় কোনো পক্ষের বাধা না থাকলে খুব শিগগিরই একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে। এতে নতুন নৌপথ পরিচালনা, নিরাপত্তা এবং সমন্বয়–সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।
যৌথ বিবৃতি প্রকাশের প্রস্তুতি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বুধবার জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য দুই দেশ যে নতুন পথ অনুসরণ করবে, সে বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। বর্তমানে যৌথ বিবৃতির খসড়া চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, দুই দেশ একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামোয় পৌঁছেছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাইরের কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ না হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করল তেহরান
ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরান।
ইসমাইল বাঘাইয়ের ভাষ্য, হরমুজ এখনো অস্থিতিশীল থাকার প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অব্যাহত হুমকিমূলক অবস্থান।
তাঁর দাবি, এসব পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নতুন সমঝোতার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের চাপের মধ্যেই সমঝোতা
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের সমঝোতার ইঙ্গিত কয়েক দিন ধরেই পাওয়া যাচ্ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, হরমুজ ইস্যুতে তেহরান একটি সমঝোতায় আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, সমঝোতা না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তবে ইরান স্পষ্ট করেছে, ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ ছিল না এবং পুরো প্রক্রিয়াটি দ্বিপক্ষীয়ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি।
ইরান–সংঘাত শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ চলাচল করত। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই জলপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
নতুন নৌপথ নিয়ে মতবিরোধ
হরমুজ প্রণালির উত্তর তীর ইরানের নিয়ন্ত্রণে, আর দক্ষিণ তীর ওমানের।
জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার আগে মাসকাট একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে মালাক্কা প্রণালির আদলে নিরাপত্তা সেবা দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ফি আদায়ের প্রস্তাব রাখা হয়।
একই সঙ্গে প্রণালির নৌপথ ইরান ও ওমানের মধ্যে ভাগ করে পরিচালনারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান পাল্টা একটি পরিকল্পনা দেয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলে এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।
নতুন ব্যবস্থায় ইরানের প্রভাব বাড়বে
সমঝোতার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ না হলেও ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ধারণা মিলছে, নতুন ব্যবস্থায় তেহরানের ভূমিকাই বেশি থাকবে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, নতুন নৌপথের বড় অংশ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে। কিছু অংশ ওমানের জলসীমা অতিক্রম করবে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে এই রুট দুই থেকে চার মাস পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হবে। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় এর মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারাও দেখছেন অগ্রগতি
ইরান–ওমান আলোচনার অগ্রগতির বিষয়টি শুধু তেহরান নয়, যুক্তরাষ্ট্রও পর্যবেক্ষণ করছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।
‘ইরানের বড় কৌশলগত অর্জন’
তেহরানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ–এর গবেষক আলী আকবর দারেইনির মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে এই সমঝোতা সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য।
আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই সমঝোতার মাধ্যমে ইরান প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
তাঁর মতে, তেহরানের লক্ষ্য শুধু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখাও তাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ চালু হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে ইরান, ওমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
যদি সমঝোতা কার্যকর হয় এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকভাবে পুনরায় শুরু হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা কমতে পারে। তবে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, আঞ্চলিক উত্তেজনা কিংবা নতুন কোনো সংঘাত দেখা দিলে এই উদ্যোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।