ঢাকা

প্রতারকদের ফাঁদে পা দেবেন না, কানাডার জব ভিসা পাওয়ার সঠিক উপায় জানুন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, জাল LMIA ও নকল সরকারি ওয়েবসাইটে প্রতারণা বাড়ছে; বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—‘গ্যারান্টিযুক্ত ভিসা’ শুনলেই সতর্ক হোন

কানাডায় উচ্চ বেতনের চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারক চক্রগুলো আরও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল ব্যবহার করছে। ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, জাল ভিসা অনুমোদনপত্র (Approval Letter), নকল Labour Market Impact Assessment (LMIA) এবং সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি ভুয়া পোর্টাল ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বাড়ছে।

সম্প্রতি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে এমনই একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের দুই সদস্য—মারিফুল ইসলাম ও বাচ্চা বাউ ওরফে হাসিনুরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তারা কানাডার ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, জাল ভিসা অনুমোদনপত্র এবং অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করছিল।

অভিযানে তাঁদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এবং একাধিক জাল পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে।

এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কানাডার বৈধ জব ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার প্রকৃত প্রক্রিয়া কী এবং কীভাবে প্রতারণা এড়ানো সম্ভব?

বাস্তবতা বুঝেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি

কানাডায় কাজ করতে আগ্রহী অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা দালালচক্রের প্রচারণায় প্রভাবিত হন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশটির শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র।

বর্তমানে কানাডায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেকার নাগরিকের পাশাপাশি লাখো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী (International Students) পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি খুঁজছেন। এসব শিক্ষার্থী স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্কৃতি এবং ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় তাঁদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই বিদেশি কর্মীদের চাকরি পেতে হয়।

এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত আবেদন জমা পড়ে। ফলে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি পাওয়া বাস্তবে খুবই কঠিন।

ভাষাজ্ঞান ছাড়া চাকরির সুযোগ প্রায় অসম্ভব

কানাডার সরকারি ভাষা ইংরেজি ও ফরাসি।

সেখানে কাজ করতে হলে শুধু কথোপকথনের সক্ষমতা নয়, ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণও প্রয়োজন হয়।

ইংরেজির ক্ষেত্রে সাধারণত IELTS বা সমমানের পরীক্ষার গ্রহণযোগ্য স্কোর এবং ফরাসি ভাষার জন্য TEF (Test d'Évaluation de Français) অথবা TCF (Test de connaissance du français) পরীক্ষার ফলাফল প্রয়োজন হতে পারে।

যেসব এজেন্সি বা ব্যক্তি ভাষা দক্ষতা ছাড়াই চাকরি ও ভিসা নিশ্চিত করার দাবি করে, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

কানাডার ওয়ার্ক পারমিট কী?

ওয়ার্ক পারমিট হলো এমন একটি সরকারি অনুমতি, যার মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কানাডায় বৈধভাবে কাজ করতে পারেন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আগে একটি বৈধ চাকরির অফার (Job Offer) থাকতে হয়।

এরপর অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে কানাডা সরকারের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে, ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার মতো কোনো কানাডীয় নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা পাওয়া যায়নি।

এই অনুমোদন প্রক্রিয়াকে বলা হয় Labour Market Impact Assessment (LMIA)।

তবে সব ধরনের চাকরির জন্য LMIA বাধ্যতামূলক নয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি, নির্দিষ্ট কর্মসূচি বা কিছু বিশেষ পেশায় LMIA ছাড়াও ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়।

বৈধ ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার ধাপগুলো

কানাডায় বৈধভাবে চাকরি ও ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

১. চাকরির অফার

প্রথমে কানাডার কোনো বৈধ নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাকরির অফার পেতে হবে।

২. LMIA অনুমোদন

যেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়, সেখানে নিয়োগকর্তা কানাডা সরকারের কাছে LMIA-এর জন্য আবেদন করেন এবং অনুমোদন নেন।

৩. ওয়ার্ক পারমিট আবেদন

এরপর আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়। যেমন—

বৈধ চাকরির অফার
পাসপোর্ট
শিক্ষাগত সনদ
কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ
ভাষাগত দক্ষতার সনদ
প্রয়োজন অনুযায়ী মেডিকেল পরীক্ষা
অন্যান্য সহায়ক কাগজপত্র
৪. বায়োমেট্রিক ও নিরাপত্তা যাচাই

এরপর আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, নিরাপত্তা যাচাই এবং আবেদন মূল্যায়ন করে কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।

৫. সীমান্তে চূড়ান্ত অনুমোদন

ভিসা অনুমোদনের পর কানাডায় পৌঁছালে দেশটির সীমান্ত কর্মকর্তার চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

অনেকেই মনে করেন, কোনো ব্যক্তি বা স্পনসর চাইলে সরাসরি কানাডার ভিসা করিয়ে দিতে পারেন।

বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের মতো কানাডায় ‘কফিল’ বা ব্যক্তিগত স্পনসরের মাধ্যমে ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।

কানাডার ভিসা প্রদান করে শুধুমাত্র দেশটির ফেডারেল সরকার। এমনকি প্রাদেশিক সরকারগুলোরও ভিসা ইস্যু করার ক্ষমতা নেই।

যেসব প্রতিশ্রুতি শুনলেই সতর্ক হবেন

প্রতারক চক্র সাধারণত কয়েকটি পরিচিত কৌশল ব্যবহার করে।

তারা দাবি করে—

শতভাগ নিশ্চিত ভিসা
কোনো সাক্ষাৎকার ছাড়াই চাকরি
দুই-তিন মাসেই স্থায়ী বাসিন্দা (PR)
ভাষাজ্ঞান ছাড়াই উচ্চ বেতনের চাকরি
বিশেষ সরকারি কোটা
‘কানাডায় কাজের অভাব নেই’

বাস্তবে কানাডা সরকার বা ইমিগ্রেশন বিভাগ কখনোই আগাম ভিসার নিশ্চয়তা দেয় না।

প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করা হয় এবং কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সি ভিসা অনুমোদনের গ্যারান্টি দিতে পারে না।

প্রতারকরা যেভাবে ফাঁদ পাতে

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতারণার জন্য সাধারণত তারা—

নামী প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে জাল চাকরির অফার লেটার তৈরি করে।
ভুয়া LMIA ও ওয়ার্ক পারমিট দেখায়।
নকল ভিসা অনুমোদনপত্র পাঠায়।
সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডাপ্রবাসীদের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেয়।
অগ্রিম মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে।
কানাডার +১ কান্ট্রি কোড ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমোতে ফোন দিয়ে নিজেদের কানাডা থেকে যোগাযোগকারী হিসেবে পরিচয় দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, +১ নম্বর ব্যবহার করলেই যে ফোনটি কানাডা থেকেই করা হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া ভুল। ইন্টারনেটভিত্তিক কলিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই এ ধরনের নম্বর ব্যবহার করা সম্ভব।

চাকরির অফার পাওয়ার পর যা যাচাই করবেন

কোনো চাকরির প্রস্তাব পেলে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই পরীক্ষা করা উচিত।

প্রথমত, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে রয়েছে কি না, তাদের ঠিকানা, ফোন নম্বর ও অফিসিয়াল ওয়েবসাইট মিলিয়ে দেখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চাকরির অফার লেটারে উল্লেখ করা বেতন, কর্মস্থল, দায়িত্ব ও চুক্তির শর্ত বাস্তবসম্মত কি না তা যাচাই করতে হবে।

তৃতীয়ত, ই-মেইলটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডোমেইন থেকে এসেছে নাকি সাধারণ ফ্রি ই-মেইল ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, কোনো ওয়েবসাইটে ভিসা যাচাই করতে বলা হলে সেটি প্রকৃত সরকারি ওয়েবসাইট কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।

অর্থ লেনদেনের আগে সতর্কতা

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—

ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানো উচিত নয়।

সব ধরনের অর্থ লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে।

কোনো চুক্তিপত্র বা নথিতে স্বাক্ষরের আগে তা ভালোভাবে পড়ে বুঝতে হবে।

সন্দেহ হলে অনুমোদিত কানাডীয় ইমিগ্রেশন পরামর্শক বা আইনজীবীর মতামত নেওয়া উচিত।

ওয়ার্ক পারমিট মানেই স্থায়ী বসবাস নয়

সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—ওয়ার্ক পারমিট পেলেই স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাসের অধিকার (Permanent Residence বা PR) পাওয়া যায়।

বাস্তবে ওয়ার্ক পারমিট একটি অস্থায়ী কর্ম-অনুমতি।

পরবর্তীতে নির্ধারিত অভিবাসন কর্মসূচির শর্ত পূরণ, প্রয়োজনীয় ভাষা দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য যোগ্যতার ভিত্তিতে কেউ চাইলে স্থায়ী বাসিন্দার জন্য আবেদন করতে পারেন।

অর্থাৎ ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া মানেই নিশ্চিত PR নয়।

প্রতারণা থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণে কানাডা এখনো আকর্ষণীয় গন্তব্য হলেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে শর্টকাট বলে কিছু নেই।

যে কোনো চাকরির প্রস্তাব, ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম, সঠিক তথ্য এবং বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি অস্বাভাবিক দ্রুত ভিসা, নিশ্চিত চাকরি বা শতভাগ সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেটিকে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা উচিত।

সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং বৈধ আবেদন প্রক্রিয়াই কানাডায় নিরাপদ কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স