ঢাকা

‘জুলাই সবার সম্পদ, একে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো কেন’—জামায়াত আমির

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যদি জাতির সবার হয়, তাহলে সেটিকে দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও অর্জনকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বুধবার (৬ আগস্ট) রাতে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দ্রোহের জুলাই: স্মৃতি প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও স্মৃতি সম্মেলন’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রকৌশল অঙ্গনের শহীদদের স্মরণে দ্য ফোরাম অব ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টস, বাংলাদেশ (এফইএবি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

‘জুলাই যদি সবার হয়, তাহলে দলীয়করণ কেন?’

বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সব রাজনৈতিক মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের যৌথ সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এটিকে দলীয়করণ বা রাজনৈতিক মালিকানার প্রশ্নে বিভক্ত করা উচিত নয়।

তিনি বলেন,

“এই জুলাই আমাদের সকলের যদি হয়, তাহলে জুলাইকে আমরা কেন রাজনীতিকরণ করব? এটা তো হওয়া উচিত নয়।”

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হলে আগে মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

তাঁর ভাষায়, “সবাইকে ধারণ করতে হবে। যাঁর যতটুকু সম্মান প্রাপ্য, তাঁকে সেটুকু সম্মান দিতে হবে।”

‘একই কাজের জন্য একজন বীর, আরেকজন সন্ত্রাসী হতে পারে না’

জামায়াত আমির বলেন, দলটি এমন একটি জাতীয় ঐক্য চায়, যা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে একত্রিত করবে।

তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি নিজের দলের হলে একই কাজের জন্য তাঁকে বীর বলা হবে, আর অন্য দলের হলে তাঁকে সন্ত্রাসী বলা হবে—এমন দ্বৈত মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন,

“আমার সন্তান যে কাজ করলে বীর, অন্যের সন্তান একই কাজ করলে তাকেও বীর হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। আবার অন্যের সন্তান যে কাজ করলে আমি তাকে সন্ত্রাসী বলব, আমার সন্তানও একই কাজ করলে তাকেও সন্ত্রাসী বলতে হবে।”

রাজনীতিতে ন্যায়বিচার ও সমতার এই নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

‘ফ্যাসিবাদের ছায়া এখনো রয়ে গেছে’

ডা. শফিকুর রহমানের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অতীতের স্বৈরাচারী শাসনের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং পেশাগত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতীতে যে বৈষম্য ও নিপীড়ন ছিল, তার অনেক চিহ্ন এখনো বিদ্যমান।

তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করে ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

‘২০২৪ সালে ছাত্রদের আন্দোলনেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকারবিরোধী আন্দোলন করলেও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়।

তিনি দাবি করেন, তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ২০৪১ সালের আগে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কিন্তু ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নামার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।

তিনি বলেন, তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো একাত্ম না হলে আন্দোলন সফল হতো না এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাও বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারতেন।

শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, যাঁরা আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রীয় খেতাব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানেরও দাবি জানান তিনি।

গণভোট বাস্তবায়নের প্রশ্নে অনড় অবস্থান

বক্তব্যে গণভোটের বিষয়েও নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন জামায়াতের আমির।

তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে দেওয়া অঙ্গীকার থেকে দল কোনোভাবেই সরে আসবে না এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।

তাঁর ভাষায়, জনগণের সিদ্ধান্তই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

মাহমুদুর রহমান: জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়েছে

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে জাতীয় ঐক্য কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তাঁর মতে, অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করায় সেই বিভক্তি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

তিনি বলেন, সব পক্ষ যদি যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করত, তাহলে জাতীয় ঐক্যের বার্তা আরও শক্তিশালী হতো।

মাহমুদুর রহমানের মতে, দেশের মানুষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আবারও একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য দেখতে চায়। এজন্য অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এফইএবির সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সেক্রেটারি মো. সিরাজুল ইসলাম।

এ সময় বক্তব্য দেন জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ, দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য আবদুল মান্নান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ আল আমিন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত সেলিম তালুকদারের বাবা সুলতান তালুকদারসহ আরও অনেকে।

অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং রাজনৈতিক সংস্কার ও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স