জার্মানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিপজিগ/হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সময়ে একটি কার্গো উড়োজাহাজ মাঝ আকাশে অজ্ঞাত একটি বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দুটি ঘটনাকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে জার্মান পুলিশ।
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, বিমানবন্দরের ভেতরে একটি ইউক্রেনীয় কার্গো উড়োজাহাজের কাছে বিস্ফোরকযুক্ত ড্রোনটি দেখতে পান বিমানবন্দরের এক কর্মী। পরে বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে রোবটের সাহায্যে ড্রোনটি নিষ্ক্রিয় করে। নিরাপদে ডেটোনেটর অপসারণের পর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি ধ্বংস করা হয়।
একই সময় আরেকটি ঘটনায় মাঝ আকাশে একটি অজ্ঞাত বস্তুর সঙ্গে একটি কার্গো উড়োজাহাজের সংঘর্ষ হয়। পরে উড়োজাহাজটি নিরাপদে হ্যানোভার বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরীক্ষা করে দেখা যায়, উড়োজাহাজটির গায়ে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বিমানবন্দরে বিশেষ অভিযান
স্যাক্সনি পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনটি রাতের বেলায় পার্কিংয়ে রাখা ইউক্রেনের আন্তোনভ এয়ারলাইনসের একটি কার্গো উড়োজাহাজের কাছাকাছি অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সঙ্গে সঙ্গে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল মোতায়েন করা হয়। একটি বিশেষ রোবট ব্যবহার করে বিস্ফোরকটির ডেটোনেটর খুলে ফেলা হয়। এরপর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি ধ্বংস করা হয়, যাতে আশপাশের স্থাপনা বা উড়োজাহাজের কোনো ক্ষতি না হয়।
ঘটনার কারণে বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিকের রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫৫ মিনিটে উত্তর দিকের রানওয়ে দিয়ে পুনরায় উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হলেও দক্ষিণ রানওয়ে আরও কিছু সময় বন্ধ ছিল।
পুলিশ এখনো বিস্ফোরকটির ধরন, ড্রোনটি কীভাবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করল কিংবা এর লক্ষ্য কী ছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
অজ্ঞাত বস্তুর সঙ্গে উড়োজাহাজের সংঘর্ষ
একই রাতে আরেকটি ঘটনাও তদন্তকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
একটি কার্গো উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় মাঝ আকাশে একটি অজ্ঞাত বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে নিরাপদে হ্যানোভারে অবতরণের পর উড়োজাহাজটি পরীক্ষা করে সামান্য ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই ঘটনাটির সঙ্গে বিমানবন্দরে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।
গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও লজিস্টিকস কেন্দ্র
লিপজিগ/হালে বিমানবন্দর শুধু বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি জার্মান সামরিক বাহিনী ও ন্যাটো জোটের অন্যতম কৌশলগত পরিবহনকেন্দ্র।
ইউক্রেনের আন্তোনভ এয়ারলাইনসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিও রয়েছে এই বিমানবন্দরে। যুদ্ধের সময় ইউক্রেনের বিভিন্ন ধরনের কার্গো পরিবহনে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিএইচএল-এর অন্যতম প্রধান ইউরোপীয় হাবও এই বিমানবন্দরে অবস্থিত। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
ড্রোন আতঙ্ক বাড়ছে জার্মানিতে
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জার্মানির বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনার আকাশে অনুমতিবিহীন ড্রোন উড্ডয়নের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে—
সামরিক ঘাঁটি,
বিমানবন্দর,
জ্বালানি টার্মিনাল,
সমুদ্রবন্দর,
এবং গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস কেন্দ্রগুলোর ওপর একাধিকবার রহস্যজনক ড্রোন দেখা গেছে।
এসব ঘটনার পর দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।
রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ
জার্মান নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ধারণা, এসব ঘটনার পেছনে রাশিয়ার গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের ভূমিকা থাকতে পারে।
যদিও এ পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি, তবুও তদন্তকারীরা সম্ভাব্য নাশকতা কিংবা গোয়েন্দা তৎপরতার দিকটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
জার্মানিতে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলেক্সি মাকেইয়েভ এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "রাশিয়া ছাড়া আর কারা এর পেছনে থাকতে পারে?"
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত মস্কোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
লন্ডনের কিংস কলেজ-এর নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার আর নুম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই জার্মানির আকাশে সন্দেহজনক ড্রোনের উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে।
তাঁর মতে, সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ কিংবা নাশকতার উদ্দেশ্যে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হতে পারে।
তদন্ত অব্যাহত
জার্মান পুলিশ এখন ড্রোনটির উৎপত্তি, বিস্ফোরক সংযুক্তির পদ্ধতি, সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং এটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কীভাবে সেখানে পৌঁছাল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে।
একই সঙ্গে মাঝ আকাশে কার্গো উড়োজাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো অজ্ঞাত বস্তুর প্রকৃতিও তদন্ত করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন এ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঘিরে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি জার্মানি ও ন্যাটো মিত্রদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।