নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন অবলম্বনে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা’ করছে। তাঁর ভাষায়, তেহরানের নেতাদের আচরণ কেবল তাঁকে ক্ষুব্ধই করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রেসিডেন্টই ইরানের জটিল ক্ষমতার কাঠামো, আদর্শিক অবস্থান এবং কৌশলগত রাজনীতি বুঝতে গিয়ে একই ধরনের সংকটে পড়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জিমি কার্টার থেকে শুরু করে রোনাল্ড রিগ্যান, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প—প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে অথবা রাজনৈতিক মূল্য গুনতে হয়েছে ওয়াশিংটনকে।
ট্রাম্পের নতুন হতাশা
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নেতারা কেবল তাঁর ক্ষোভ বাড়াচ্ছেন। তবে তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখনো আশা করছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা নিয়ে একটি নতুন সমঝোতা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শুল্ক আদায়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরান নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে একটি সম্ভাব্য চুক্তি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ফেলছে। যুদ্ধবিরোধী মার্কিন ভোটারদের একাংশের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
‘ইরানকে সবচেয়ে কম বুঝেছেন ট্রাম্প’
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাক মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্পই সম্ভবত ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন।
তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন, অন্যদিকে দেশটির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু কোনো পথেই তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।
পোলাকের মতে, বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কে যে হতাশা জমেছে, ট্রাম্প তারই সবচেয়ে প্রকট প্রতীক।
যুদ্ধ, নেতৃত্ব পরিবর্তন ও ব্যর্থ প্রত্যাশা
গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানে দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের আহ্বান জানান এবং এমনও বলেন যে, তিনিই ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণ করবেন।
কিন্তু তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং দেশটির কট্টরপন্থী শাসকগোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
পরে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, তিনি তাঁর বাবার চেয়েও বেশি কট্টর এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রতি আরও বেশি আগ্রহী।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁর নেতৃত্বকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করলেও তেহরান তা গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি মুখোমুখি বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের প্রকাশ্য আহ্বানেরও কোনো জবাব দেয়নি ইরান।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বোঝা কেন কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল শক্তি প্রেসিডেন্ট বা পার্লামেন্ট নয়; বরং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।
দেশটিতে নির্বাচিত সরকার থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতার হাতেই কেন্দ্রীভূত।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি বলেন, কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইরানের আদর্শিক অবস্থান ও ক্ষমতার প্রকৃত কাঠামোকে অবমূল্যায়ন করেছেন।
তাঁর মতে, বড় সমস্যা হলো—কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনোই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সুযোগ পাননি। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা সীমিত থেকে গেছে।
কার্টারের ব্যর্থ জিম্মি সংকট
১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানে জিম্মি হয়ে পড়া ৫২ মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গোপন আলোচনা শুরু করেছিলেন।
ওয়াশিংটন ভেবেছিল, একটি সমঝোতা হয়ে গেছে। বিনিময়ে ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি শেষ মুহূর্তে পুরো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
পরে কার্টার সামরিক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেও সেটিও ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দিনেই বন্দিদের মুক্তি সম্ভব হয়।
রিগ্যান ও ‘ইরান-কন্ট্রা’ কেলেঙ্কারি
১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ইরানের কিছু কথিত মধ্যপন্থী নেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
লেবাননে জিম্মি থাকা মার্কিনদের মুক্তির বিনিময়ে গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে এটি ইতিহাসের আলোচিত ‘ইরান-কন্ট্রা’ কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিতি পায়।
কারণ, ওই অস্ত্র বিক্রির অর্থ গোপনে নিকারাগুয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রাস’-এর কাছে পাঠানো হয়েছিল।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রিগ্যান প্রশাসন তীব্র রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। কয়েকজন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন।
পরে জানা যায়, যাঁদের ‘মধ্যপন্থী’ মনে করা হয়েছিল, তাঁদের অস্তিত্বই কার্যত ছিল না।
ক্লিনটনের সম্ভাবনাও থেমে যায়
১৯৯৭ সালে ইরানে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন সম্ভাবনা দেখতে শুরু করে।
খাতামি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নেন এবং ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
জবাবে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট ১৯৫৩ সালে ইরানে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখও প্রকাশ করেন।
কিন্তু সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এই উদ্যোগ পুরোপুরি নাকচ করে দেন।
ওবামার পরমাণু চুক্তি
বারাক ওবামা একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ইরানের সঙ্গে একটি বড় কূটনৈতিক চুক্তি করতে সক্ষম হন।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
তবে ওবামা প্রশাসনের আশা ছিল, এটি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রথম ধাপ হবে। বাস্তবে তা হয়নি।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চুক্তিতে সম্মতি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বদলে যায় সমীকরণ
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প হঠাৎ করেই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তই দুই দেশের মধ্যে নতুন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে, যার পরিণতিতে পরবর্তী সময়ে সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
‘ইরান সময়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে’
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অভিজ্ঞ মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানো।
তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র সব সময় দ্রুত সমাধান চায়। অন্যদিকে ইরান বিশ্বাস করে, সময় যত গড়াবে, পরিস্থিতি ততই তাদের অনুকূলে যাবে।
রস বলেন, ‘আমাদের তাড়াহুড়োকে তারা একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা দ্রুত শেষ করতে চাই, আর তারা মনে করে সময়ই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
আদর্শিক দ্বন্দ্বই মূল বাধা
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের জটিলতার মূল কারণ শুধু কূটনৈতিক মতপার্থক্য নয়; বরং দুই দেশের আদর্শিক অবস্থানও।
যুক্তরাষ্ট্র বহুবার ইরানের ভেতরে ‘মধ্যপন্থী’ শক্তির উত্থানের আশা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস রাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
ফলে চার দশকের বেশি সময় ধরে কার্টার, রিগ্যান, ক্লিনটন, ওবামা কিংবা ট্রাম্প—কেউই ইরানের সঙ্গে স্থায়ী ও টেকসই সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বরং প্রতিবারই প্রমাণিত হয়েছে, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা ওয়াশিংটনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পররাষ্ট্রনীতি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।