সরকার পতনের আগে–পরে আত্মীয়দের দেশত্যাগ, বিপাকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা; সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি শেখ পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক রাজনৈতিক ও দলীয় সূত্রের দাবি, সরকার পতনের আগে ও পরে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের প্রায় সবাই নিরাপদে দেশ ছাড়তে সক্ষম হয়েছেন। বিপরীতে আওয়ামী লীগের বহু কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বা আইনি জটিলতায় পড়েছেন।
এ নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ ও ক্ষোভ রয়েছে বলে দল-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তাপসের ফোনকল: দেশ ছাড়ার চেষ্টার ইঙ্গিত
সরকার পতনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপের অডিও।
ফোনটি করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে। কথোপকথনে তাপস শেখ হাসিনাকে সালাম জানিয়ে বলেন, তিনি সিঙ্গাপুর যেতে চান এবং অনুমতি চান। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, "হ্যাঁ, যাও। যাবা না কেন?"
কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, তাপস তখন বিমানবন্দরে ছিলেন। তবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটকে দিলে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ঘটনাটি ঘটে এমন এক সময়ে, যখন সারা দেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং সরকার টালমাটাল অবস্থায় ছিল।
৩ আগস্ট: আন্দোলনের মোড় ঘোরানো দিন
২০২৪ সালের ৩ আগস্টকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সেদিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে কোটা সংস্কার আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।
একই দিন সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক দরবারে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে আপত্তির কথাও উঠে আসে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শেখ পরিবারের একাধিক সদস্য নীরবে দেশ ছাড়েন বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি।
প্রায় সবাই বিদেশে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের অধিকাংশই বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ ভারতের বিভিন্ন শহরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলকাতার অভিজাত আবাসিক এলাকায় তাঁদের অবস্থানের দাবিতে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওও প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এসব তথ্যের সবগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
সরকার পতনের আগে ও পরে শেখ পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত সদস্যদের মধ্যে কেবল শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ গ্রেপ্তার হন। তবে তিনি সক্রিয় রাজনীতির চেয়ে ব্যবসার সঙ্গেই বেশি যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও পরিবারের সদস্যরা
৫ আগস্ট দেশত্যাগের সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পতনের দুই দিন আগে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় এসেছিলেন।
ভারতে যাওয়ার পর শেখ রেহানা কখনো ভারত, কখনো যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। তবে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি।
একই সফরে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা এবং শেখ রেহানার দেবর তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
জয়, পুতুল ও রাদওয়ান
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। সরকার পতনের সময়ও তিনি সেখানেই ছিলেন। পরে ভারতের গিয়ে মায়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের আলোচনা রয়েছে।
শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন। তাঁর কর্মস্থল ভারতের নয়াদিল্লি। সরকার পতনের পর তাঁকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো হলেও তিনি বেতন পাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে তিনি দিল্লি ও দুবাইয়ের মধ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) আওয়ামী লীগের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর কার্যক্রম তদারকি করতেন। সরকার পতনের সময় তিনি থাইল্যান্ডে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য এবং ব্রিটিশ নাগরিক। তাঁর বোন আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীও যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
শেখ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অবস্থান
সরকার পতনের আগে ও পরে শেখ পরিবারের আরও অনেক সদস্য বিদেশে চলে যান বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ সরকার পতনের পর ভারত হয়ে কানাডায় যান। পরে তিনি আবার ভারতে ফিরে আসেন বলে জানা গেছে।
শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ সরকার পতনের আগেই ভারতে চলে যান। তাঁর ছেলে আশিক আবদুল্লাহও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে।
এ ছাড়া শেখ হেলাল উদ্দীন, শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ তন্ময়, শেখ সেলিম, শেখ ফজলে নাঈম, নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন), নিক্সন চৌধুরী, আবুল খায়ের আবদুল্লাহসহ পরিবারের একাধিক সদস্য বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, তাঁদের কেউ সাতক্ষীরা, কেউ সিলেট, আবার কেউ ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে তাঁদের দেশত্যাগ সম্ভব হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ।
ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল শেখ পরিবার
আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ পরিবারের সদস্যরা সরকার ও দলে অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন।
২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনাসহ তাঁর স্বজনদের অন্তত আটজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ ছিলেন মন্ত্রী, কেউ সংসদ সদস্য, কেউ মেয়র, কেউ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, আবার কেউ যুবলীগ ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে একই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কাঠামোকে অনেকাংশে পারিবারিক বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
বিপরীতে কারাগারে বহু নেতা
শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দেশ ছাড়তে সক্ষম হলেও আওয়ামী লীগের বহু জ্যেষ্ঠ নেতা কারাগারে রয়েছেন।
সরকার পতনের পর তিন ডজনের বেশি সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং অর্ধশতাধিক সাবেক সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হন।
বর্তমানে কারাগারে থাকা কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন কাজী জাফর উল্যাহ, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপ।
এ ছাড়া শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও কারাগারে রয়েছেন।
অন্যদিকে সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে থাকাকালে মারা যান। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। জামিনে মুক্তির পর মারা যান ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও দবিরুল ইসলাম।
দলে ক্ষোভের আলোচনা
আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, শেখ পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে দেশ ছাড়লেও বহু নেতা-কর্মী সেই সুযোগ পাননি। ফলে তৃণমূলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনেক নেতা-কর্মীর অভিযোগ, ক্ষমতার সময়ে যাঁরা সুবিধা ভোগ করেছেন, সংকটের সময় তাঁরাই আগে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন; অথচ মাঠপর্যায়ের নেতারা গ্রেপ্তার ও মামলার মুখে পড়েছেন।
বিশ্লেষকের মন্তব্য
রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা কাঠামো ধীরে ধীরে পারিবারিক চরিত্র ধারণ করেছিল।
তাঁর ভাষ্য, ক্ষমতায় থাকার সময় পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও পদধারীরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। আর রাজনৈতিক সংকটের সময় সাধারণ নেতা-কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
তবে এসব মূল্যায়ন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতামত; এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। একইভাবে বিদেশে অবস্থান ও দেশত্যাগের পথসংক্রান্ত অনেক তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি ও রাজনৈতিক মহলের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত, যার সবগুলোর স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।