বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভুল স্বীকার করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করলেও, মরক্কোয় অনুষ্ঠিত ফিফার নির্বাহী পর্যায়ের বৈঠকে পূর্ণ সমর্থন পাওয়ায় সভাপতি পদে বহাল রয়েছেন।
বিতর্কিত পরিকল্পনাটি বাতিল হওয়ার পর ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি জরুরি ভিত্তিতে ফিফার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক ডাকেন। রাবাতে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠক শেষে ফিফা এক বিবৃতিতে জানায়, সংস্থার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা অটুট রয়েছে।
বিবৃতিতে মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোমসহ উপস্থিত কর্মকর্তারা বলেন, ২১১টি সদস্যদেশের ভোটে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর প্রতি তারা পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছেন।
প্রস্তাবটি যেভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল, তা নিয়ে ফিফার ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। পরিকল্পনা প্রত্যাহারের পর ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়। তবে বৈঠকের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে ফিফা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম যৌথভাবে সদস্যদেশগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পুরো ঘটনার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
রাবাতে বৈঠক শেষে ইনফান্তিনো, গ্রাফস্ট্রোম এবং মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা একসঙ্গে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের একটি ম্যাচ উপভোগ করেন। লেকজা শুরু থেকেই ইনফান্তিনোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে বিচক্ষণ পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে ফিফার টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সদস্যদেশগুলোকে প্রায় ৪ কোটি ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল এতে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই বিভিন্ন মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ফিফা।
বিশেষ করে উয়েফা, কনক্যাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকিও দেয়, ফলে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করা হয়।
ফিফা জানিয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সদস্যদেশ ও ফিফা কাউন্সিলকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি—এটি একটি বড় ভুল ছিল। সংস্থার মতে, বিষয়টি আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।
একই সঙ্গে ফিফা দাবি করেছে, সংবাদমাধ্যমে পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পর যেসব ভুল হয়েছে, সেগুলোও তারা স্বীকার করেছে। তবে সংস্থার ভাবমূর্তি ও সুশাসন নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে তারা।
এদিকে মরক্কোকে ২০৩০ বিশ্বকাপ ফাইনালের আয়োজক করার কোনো গোপন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও অস্বীকার করেছে ফিফা। তাদের ভাষ্য, ফাইনালের ভেন্যু যথাসময়ে নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
ক্ষমা চাইলেও সমালোচনা পুরোপুরি থামেনি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে সাবেক পর্তুগিজ তারকা লুইস ফিগো প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ দাবি করে বলেন, ফুটবলের স্বার্থে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন।
সব বিতর্কের মধ্যেও ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো আগামী সভাপতি নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের মার্চে মরক্কোয় অনুষ্ঠিতব্য ফিফা কংগ্রেসে নির্বাচন হবে। জয়ী হতে হলে ২১১ সদস্যদেশের মধ্যে অন্তত ১০৬টি ভোট প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে উয়েফা এখনো ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। সংস্থাটি আগেই জানিয়েছে, বর্তমান নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা নেই এবং প্রয়োজন হলে আইনি পথেও হাঁটতে পারে। কয়েকটি ইউরোপীয় সদস্যদেশ ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্বের সমর্থনও প্রত্যাহার করেছে।
ফিফার দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু ত্রুটি থাকলেও সব সিদ্ধান্ত বিদ্যমান নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির আশা, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে সুশাসন আরও শক্তিশালী করবে এবং সদস্যদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।