২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় আসন্ন শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য প্রায় ২৫ লাখ আসনের বিপরীতে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ফলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ সব বোর্ডের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম ও আসনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
তিনি জানান, এবারও আগের নিয়মেই একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি বা ভর্তি পরীক্ষা কোনোটিই থাকবে না। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন ও শিক্ষার্থী মনোনয়ন করা হবে।
লটারি বা ভর্তি পরীক্ষা নয়, ফল ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে ভর্তি
অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম আগের মতোই পরিচালিত হবে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে লটারি কিংবা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ‘ভর্তি কার্যক্রম আগের মতোই। লটারিও না, ভর্তি পরীক্ষাও না। প্রচলিত যে বিধান, অর্থাৎ জিপিএ এবং শিক্ষার্থীদের চাহিদার (পছন্দক্রম) ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ হবে।’
গত কয়েক বছর ধরেই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সরাসরি কলেজে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করতে হয়।
সর্বনিম্ন পাঁচ, সর্বোচ্চ ১০টি প্রতিষ্ঠানের পছন্দ
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য একজন শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। আবেদনের সময় শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে পারেন।
এরপর শিক্ষার্থীর এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার ফলাফল, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোটা এবং আবেদন করার সময় দেওয়া পছন্দক্রম বিবেচনায় নিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়।
ফলে কোনো শিক্ষার্থী তার পছন্দের একাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিলেও ফলাফল ও আসনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেতে পারেন।
কলেজ ও মাদরাসায় কেন্দ্রীয় পদ্ধতিতে ভর্তি
এই কেন্দ্রীয় অনলাইন ভর্তি পদ্ধতিতে মূলত কলেজ ও মাদরাসায় একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির প্রক্রিয়া আলাদাভাবে সম্পন্ন হয়।
এ ছাড়া রাজধানীর নটর ডেম কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রচলিত কেন্দ্রীয় ভর্তি ব্যবস্থার বাইরে নিজস্ব নিয়মে শিক্ষার্থী ভর্তি করে থাকে।
দেশের প্রায় সব সাধারণ কলেজ ও মাদরাসায় অবশ্য কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমেই একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি সম্পন্ন হয়।
বুয়েটের কারিগরি সহায়তায় অনলাইন ভর্তি
একাদশ শ্রেণির কেন্দ্রীয় অনলাইন ভর্তি কার্যক্রম ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ কাজে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে বিভিন্ন কলেজে গিয়ে আবেদন করতে হয় না। অনলাইনে পছন্দক্রম দেওয়ার পর ফলাফল, আসনসংখ্যা ও অন্যান্য নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীকে ভর্তির জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়।
সরকার পরিবর্তনের পর একাদশ শ্রেণিতেও ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য সেই পরিবর্তন হচ্ছে না। আগের মতোই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার সম্ভাবনা
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, সারা দেশে কলেজ ও মাদরাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ।
গত বছর মোট আসনের ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। ফলে প্রায় ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ আসন খালি ছিল।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার আরও কম হওয়ায় খালি আসনের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এবার সব শিক্ষা বোর্ডের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থেকে যেতে পারে।
অর্থাৎ মোট আসনের তুলনায় এবার ভর্তির জন্য যোগ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে বিপুলসংখ্যক আসন পূরণ হবে না।
এবার এসএসসি ও সমমানে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন
সোমবার (১০ আগস্ট) ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
অর্থাৎ প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
পাস করা শিক্ষার্থীদের সবাই যদি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তারপরও দেশের কলেজ ও মাদরাসাগুলোর প্রায় ২৫ লাখ আসনের বড় একটি অংশ খালি থেকে যাবে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরও হিসাবের মধ্যে ধরলে আসনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষার্থীর ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়। সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণির সমমান পর্যায়ে ভর্তি হলেও আনুমানিক ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন পূরণ হবে না।
পাসের হার কমায় এবার খালি আসন আরও বাড়বে
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন খালি থাকে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান ও এলাকার বাইরে থাকা কলেজগুলোতে অনেক আসন শেষ পর্যন্ত পূরণ হয় না।
গত বছরও দেশের মোট আসনের প্রায় ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ খালি ছিল। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় খালি আসনের পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি আসনের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে অনেক কলেজ ও মাদরাসাকে শিক্ষার্থী সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তুলনামূলক কম, সেসব প্রতিষ্ঠানে আসন পূরণ করা আরও কঠিন হতে পারে।
ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে এখন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এখন উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সামনে পরবর্তী ধাপ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি। কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল, পছন্দের প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে।
ভর্তি কার্যক্রমের বিস্তারিত সময়সূচি, আবেদন শুরুর তারিখ, আবেদন ফি, পছন্দক্রম দেওয়ার নিয়ম, ফল প্রকাশ ও নিশ্চায়নের সময়সীমাসহ অন্যান্য তথ্য শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে জানাবে।
তবে চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য একটি বিষয় ইতিমধ্যে স্পষ্ট—একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে কোনো কেন্দ্রীয় লটারি বা ভর্তি পরীক্ষা থাকছে না। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল, প্রযোজ্য কোটা এবং শিক্ষার্থীর পছন্দক্রমের ভিত্তিতেই অনলাইনে প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হবে।
আর এবার এসএসসি ও সমমানে পাসের হার কম হওয়ায় দেশের কলেজ ও মাদরাসাগুলোর বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার বিষয়টিই একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠতে পারে।