বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর সম্মতিসূচক স্বাক্ষর বা লিখিত সম্মতিবিবৃতি জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিএনপির ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, মির্জা ফখরুল ইতিমধ্যে এমন একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন। গত শনিবার তিনি ওই বিবৃতিতে সই করেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও সমর্থনের পাশাপাশি প্রার্থী ওই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত—এমন একটি স্বাক্ষরিত ঘোষণা বা বিবৃতি জমা দিতে হয়।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। এই জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে।
ফলে একদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম প্রায় নিশ্চিত হওয়ার খবর, অন্যদিকে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত—দুই ঘটনাকে ঘিরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এবং বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে তাঁর প্রার্থিতার বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব আগেই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছিল। গত ২ আগস্ট বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর থেকেই দলের ভেতরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় ছিল। এখন তাঁর প্রার্থিতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তবে বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও মনোনয়নপত্র দাখিল না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে দলীয়ভাবে ঘোষিত সিদ্ধান্ত বলা যাচ্ছে না।
মনোনয়নপত্রে সম্মতির স্বাক্ষর গুরুত্বপূর্ণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সম্মতির বিষয়টি আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে শুধু দলীয় সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে নিজে ওই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবং দায়িত্ব গ্রহণে সম্মতি জানাতে হয়।
আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও সমর্থনের পাশাপাশি প্রার্থীর স্বাক্ষর করা সম্মতিসূচক ঘোষণা বা বিবৃতি জমা দিতে হয়।
মির্জা ফখরুল ওই ধরনের একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। এর ফলে তাঁর রাষ্ট্রপতি প্রার্থিতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিএনপির সংগ্রহ করা দুটি মনোনয়নপত্র নিয়ে কৌতূহল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিও শুরু করেছে। সোমবার সকালে দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দপ্তর থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
একই প্রার্থীর জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহের ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল করার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে যেকোনো একটি মনোনয়নপত্র বৈধ হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনেও তাঁর নামে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর নির্বাচন
সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। এরপর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
একাধিক প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ ভবনে ভোট গ্রহণ হবে।
রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব কে?
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা যতই স্পষ্ট হচ্ছে, ততই বিএনপির ভেতরে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন?
মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতা। তিনি ২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থানের সময় দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। দলীয় সূত্র ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের মতে, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে তিনি গেলে বিএনপির মহাসচিবের পদটি শূন্য হবে। আর সেই পদে কে আসবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আলোচনায় সালাহউদ্দিন আহমদ ও রিজভী
বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মহাসচিব পদের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দুজন নেতার নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। তাঁরা হলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপি জাতীয় কাউন্সিলের আগে সাময়িকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় কাউন্সিল বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে মহাসচিব পদে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি এবং তাঁকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। ফলে দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন।
তবে এ বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমাদকে প্রার্থী করেছে ১১-দলীয় জোট
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিপরীতে রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য।
রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
অলি আহমদ বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা। বর্তমানে তিনি এলডিপির চেয়ারম্যান। তাঁর মতো একজন প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে বিরোধী জোট একদিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে চাইছে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থানও জানান দিতে চাইছে।
জুলাই সনদ ও সংস্কার নিয়ে বিএনপির সমালোচনা
রাষ্ট্রপতি পদে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি অনীহা দেখিয়েছে।
তাঁর দাবি, বিএনপি পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতোই রাষ্ট্র পরিচালনার পথে এগোচ্ছে। বিরোধী জোট আশা করেছিল, জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিএনপি সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়নি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি সংস্কারের পথে এগোলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী দিতে পারত। কিন্তু সে উদ্যোগ না থাকায় ১১-দলীয় ঐক্য নিজেদের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অলি আহমদকে ঘিরে আগের আলোচনাও ছিল
রাজনীতি–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আকস্মিক নয়। জাতীয় নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে।
এবার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তকে সেই রাজনৈতিক আলোচনারই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেকে।
১১-দলীয় ঐক্যের বৈঠকে অলি আহমদ নিজেও উপস্থিত ছিলেন। পরে সংবাদ সম্মেলনেও তিনি অংশ নেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে অলি আহমদ জোটের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই।
অলি আহমদ বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং পরীক্ষিত একজন লোক, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নাই, শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো অভিযোগ নাই, সুন্দরভাবে জীবনযাপন করেছি বিধায় সবাই সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাম প্রস্তাব করেছে।’
তাঁর মতে, তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে ১১-দলীয় ঐক্য জনগণের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
পরাজয় জেনেও কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিরোধী জোট?
জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা কার্যত নেই। এরপরও অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে বলে জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, নির্বাচনে জয়লাভের চেয়ে কার্যকর বিরোধী দলের উপস্থিতি দৃশ্যমান করাই এই মুহূর্তে বড় বিষয়।
বিরোধী দল মনে করছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নীরব থাকা কিংবা সরকারি দলের প্রার্থীকে সমর্থন করার পরিবর্তে সংসদের ৯০ জন বিরোধী সদস্যকে সক্রিয়ভাবে ভোটের প্রক্রিয়ায় রাখা রাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। তাহলে গণতন্ত্রের গতি ফিরে আসবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের জন্য এটা দায়িত্ব হিসেবে আমরা নিয়েছি।’
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই নির্বাচন উভয়ের (সরকার ও বিরোধী দল) মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।’
তাঁর মতে, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কেবল সরকারের সঙ্গে সংঘাতে সীমাবদ্ধ না রেখে গঠনমূলক সমালোচনা ও বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার মধ্য দিয়েও কার্যকর করা সম্ভব। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে তিনি সেই ধরনের রাজনীতির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
একজন সংসদ সদস্য একটি ভোট দিতে পারেন। নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করবে।
প্রতিটি ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে। কাউন্টার ফয়েল বা চেকমুড়িতে ভোটারের নাম ও স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকবে। আর ব্যালটের যে অংশে ভোট দেওয়া হবে, সেখানে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম আদ্যক্ষর অনুযায়ী মুদ্রিত থাকবে।
সংসদ সদস্য তাঁর পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত স্থানে নিজের পূর্ণ নাম ও স্বাক্ষর করবেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী থাকলেও সংসদে ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা অনুমেয়। এর অন্যতম কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ।
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি ওই দলের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
বিরোধী জোটের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই এই বিধানের সংস্কারের দাবি করে আসছেন। তাঁদের মতে, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হয়েছিল মাত্র একবার।
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপি ১৪০টি আসন এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে।
সেবার রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছিল। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
এরপর আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দল প্রার্থী দেয়নি। ফলে সংসদে ভোটাভুটির প্রয়োজনও হয়নি।
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছে। অলি আহমদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে আগামী ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণ হবে।
ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি শুরু করেছে।
তফসিল ঘোষণার দিনই ভোটারের বিভক্তি সংখ্যাসহ জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন ভোটারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ইসি সূত্র জানিয়েছে, শুরুতে কমিশনের ধারণা ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাভুটির প্রয়োজন নাও হতে পারে।
তবে বিরোধী জোট প্রার্থী ঘোষণা করায় এখন ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
ইতিমধ্যে কমিশন ব্যালট ছাপানো, ভোট ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। ওই সময়ের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপার ছাপাবে।
সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকলেও ভোট হতে পারে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলমান থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা হয়েছে, সংসদ অধিবেশনের বাইরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন নির্ধারণ করতে পারে।
ভোট গ্রহণের দিন সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হবে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
ফলে বিরোধী জোটের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
সব মিলিয়ে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সমীকরণ, বিরোধী জোটের রাজনৈতিক কৌশল এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিবের পদটি শূন্য হবে। ফলে দলটির সাংগঠনিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ ও রুহুল কবির রিজভীর মতো নেতাদের নাম সামনে আসায় মহাসচিব পদ নিয়ে দলের ভেতরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সংসদে নিজেদের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত জেনেও অলি আহমদকে প্রার্থী করে ১১-দলীয় বিরোধী জোট দেখাতে চাইছে, তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সক্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
তাই ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ফলাফলের দিক থেকে একতরফা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ দলীয় সমীকরণের দিক থেকে এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।