ঢাকা

কেন রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারীর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে চায় ইউক্রেন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
নিউইয়র্ক টাইমস

রাশিয়ার অনলাইন কেনাকাটার বাজারে অ্যামাজনের মতোই প্রভাবশালী একটি নাম ওয়াইল্ডবেরিজ। দেশটির সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তাতিয়ানা কিম—যিনি বর্তমানে রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে তাঁর গড়ে তোলা বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এখন নজিরবিহীন সংকটের মুখে।

রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াইল্ডবেরিজের গুদাম ও সরবরাহ অবকাঠামোয় ধারাবাহিকভাবে ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে হামলার মাত্রা বেড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ২৩টি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা গেছে। এসব হামলায় কয়েক শ কোটি ডলারের পণ্য ধ্বংস হয়েছে এবং ওয়াইল্ডবেরিজের অন্তত নয়জন কর্মী নিহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের এই কৌশল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। কারণ, এতদিন রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামো, তেল শোধনাগার, জ্বালানি স্থাপনা ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকেন্দ্রগুলোই ছিল ইউক্রেনের পাল্টা হামলার প্রধান লক্ষ্য। এবার একটি বড় বেসরকারি ভোক্তা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থাকে ধারাবাহিকভাবে আঘাত করা হচ্ছে।

কিয়েভের যুক্তি, ওয়াইল্ডবেরিজ শুধু সাধারণ ভোক্তাদের পণ্য সরবরাহ করে না; রুশ সেনাদের ব্যবহারের উপযোগী বিভিন্ন সরঞ্জামও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিক্রি হয়। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার মোট খুচরা পণ্য বিক্রির প্রায় ১০ শতাংশ ওয়াইল্ডবেরিজের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোতে আঘাত করলে তা রুশ অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলবে।

তবে তাতিয়ানা কিম এই হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওয়াইল্ডবেরিজ মূলত একটি সাধারণ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। তাঁর ভাষায়, অ্যামাজন কিংবা চীনের আলিবাবায় যে ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, ওয়াইল্ডবেরিজেও একই ধরনের পণ্য বিক্রি হয়।

একটি খাতা, একটি ধ্বংসস্তূপ ও বদলে যাওয়া ব্যবসা

ওয়াইল্ডবেরিজের সংকট বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠানটির বিশাল পরিসরটি বোঝা জরুরি। বছরের পর বছর ধরে রাশিয়ার ভোক্তা অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশজুড়ে তাদের প্রায় ৯৫ হাজার পণ্য সংগ্রহকেন্দ্র রয়েছে। রাশিয়ার অর্ধেকের বেশি মানুষ মাসে অন্তত একবার ওয়াইল্ডবেরিজ থেকে কেনাকাটা করেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

ফলে প্রতিষ্ঠানটির গুদামগুলো শুধু পণ্য সংরক্ষণের জায়গা নয়; এগুলো রাশিয়ার দৈনন্দিন ভোক্তা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

মস্কোভিত্তিক ই-কমার্স পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেটা ইনসাইটের হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলায় ওয়াইল্ডবেরিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গুদাম ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব হামলায় প্রায় ৪৮ হাজার কোটি রুবেল বা প্রায় ৫৯০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য নষ্ট হয়েছে।

ডেটা ইনসাইটের বিশ্লেষক সের্গেই সেমকো বলেন, ওয়াইল্ডবেরিজের সবচেয়ে বড় গুদামগুলোর অনেকগুলোই কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, প্রায় প্রতিদিনই একটি করে গুদাম পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।

এর প্রভাব ইতিমধ্যে রাশিয়ার অনলাইন বাজারে দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুশ ব্যাংক Sberbank-এর গবেষণা বিভাগ সবারইনডেক্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ওয়াইল্ডবেরিজের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খাদ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের কেনাকাটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর পেছনে ইউক্রেনের ধারাবাহিক বিমান হামলার প্রভাব থাকতে পারে বলে বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য ছাড়িয়ে এর প্রভাব এখন সাধারণ মানুষের কেনাকাটা, ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থাতেও পৌঁছে যাচ্ছে।

যুদ্ধের মধ্যেই উত্থান তাতিয়ানা কিমের

তাতিয়ানা কিমের ব্যবসায়িক গল্পও রাশিয়ার পরিবর্তিত অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

রুশ পরিবারে জন্ম নেওয়া কোরীয় বংশোদ্ভূত কিম পেশাগত জীবনের শুরুতে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি তাঁর তৎকালীন স্বামী ভ্লাদিস্লাভ বাকালচুককে সঙ্গে নিয়ে ওয়াইল্ডবেরিজ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে ইউরোপের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক বিক্রি করত প্রতিষ্ঠানটি।

এরপর রাশিয়ায় অনলাইন কেনাকাটার বাজার দ্রুত বাড়তে থাকায় ওয়াইল্ডবেরিজও বিস্তৃত হতে থাকে। ধীরে ধীরে পোশাকের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস, প্রসাধনী, গৃহস্থালির পণ্যসহ অসংখ্য পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হয় প্রতিষ্ঠানটি।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর ওয়াইল্ডবেরিজের গুরুত্ব আরও বাড়ে। পশ্চিমা বহু কোম্পানি রাশিয়ার বাজার ছেড়ে চলে যাওয়ায় ভোক্তাদের পণ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে।

এই সময় তাতিয়ানা কিম শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, রুশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

২০২৪ সালে ওয়াইল্ডবেরিজকে একটি রুশ বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হয়। ধারণা করা হয়, রুশ সরকারের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি হয়েছিল। কিমের তৎকালীন স্বামী বাকালচুক এই একীভূতকরণকে ‘করপোরেট দখল’ বলে অভিযোগ করেন।

এরপর বিরোধ ভয়াবহ রূপ নেয়।

বাকালচুক একপর্যায়ে সশস্ত্র চেচেনদের একটি দল নিয়ে মস্কোর ওয়াইল্ডবেরিজ কার্যালয়ে হাজির হন। সেখানে গোলাগুলিতে দুজন নিহত ও সাতজন আহত হন। পরের বছর কিম ও বাকালচুকের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

ব্যবসায়িক বিরোধের সেই অধ্যায় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার ইউক্রেনের হামলা তাঁর সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেন ওয়াইল্ডবেরিজকে লক্ষ্য করছে ইউক্রেন

ইউক্রেনের দৃষ্টিতে ওয়াইল্ডবেরিজ কেবল একটি সাধারণ অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম নয়।

কিয়েভের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, নেভিগেশন সরঞ্জাম, বুলেটপ্রুফ পোশাক ও হেলমেটের মতো সামগ্রী রয়েছে।

অবশ্য ওয়াইল্ডবেরিজের নিজস্ব নীতিমালায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে রুশ সেনা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য নানা সরঞ্জাম কিনেছেন বলে জানা যায়।

নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগস্টের শুরুতেও ওয়াইল্ডবেরিজে ক্যামেরার সরাসরি দৃশ্য দেখে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন ড্রোন বিক্রির বিজ্ঞাপন ছিল। এসব ড্রোনে বিস্ফোরক বহনের ব্যবস্থা ছিল। ড্রোন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের জন্য ফাইবার-অপটিক তারের রোলও সেখানে বিক্রি করা হচ্ছিল।

একটি বিজ্ঞাপনে বিস্ফোরক বহনে সক্ষম একটি ড্রোন বিক্রির কথা বলা হয়। বিজ্ঞাপনটির প্রশ্নোত্তর অংশে সম্ভাব্য ক্রেতারা ড্রোনটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ কেউ বড় পরিমাণে কিনলে ছাড় পাওয়া যাবে কি না, সেটিও জানতে চান।

কিছু ক্রেতা আবার সরাসরি উল্লেখ করেন, তাঁরা কোন রুশ সামরিক ইউনিটের জন্য ড্রোন কিনতে চান।

তবে এসব ড্রোন সত্যিই ক্রয় করা হয়েছে কিংবা রুশ সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি নিউইয়র্ক টাইমস।

একজন সম্ভাব্য ক্রেতা জানতে চান, ড্রোনটি ইউক্রেন যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা যাবে কি না। বিক্রেতার উত্তর ছিল—হ্যাঁ।

এই ধরনের তথ্যই ইউক্রেনের কাছে ওয়াইল্ডবেরিজকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপনের অন্যতম ভিত্তি।

হামলার কারণে ব্যবসায়িক বিপর্যয়

ইউক্রেনের হামলার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ওয়াইল্ডবেরিজের সরবরাহব্যবস্থায়।

একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তার ওয়েবসাইট বা অ্যাপ নয়; পণ্য দ্রুত গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশাল গুদাম, সংগ্রহকেন্দ্র, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো।

ওয়াইল্ডবেরিজের এসব অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক হামলা হলে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

তাতিয়ানা কিম এখন দ্রুত ব্যবসার কাঠামো বদলানোর চেষ্টা করছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াইল্ডবেরিজ পণ্য সরবরাহব্যবস্থা আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর বিকল্প তৈরি করছে।

এক অনলাইন পোস্টে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অঞ্চলের সরকার ও বিক্রেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার থেকেও বড় ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে ওয়াইল্ডবেরিজ ৮০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর জন্য দুই দফায় স্বেচ্ছা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ড্রোন হামলায় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিক্রেতারা যাতে ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন, সে জন্য সীমিত পরিসরে বিমার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

রাশিয়ার উপঅর্থমন্ত্রী আলেক্সেই সাজানভও জানিয়েছেন, ওয়াইল্ডবেরিজের বিক্রেতাদের জন্য সরকার সহায়তা দেবে। এর মধ্যে কর ছাড় এবং নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার মতো সুবিধা থাকবে।

এতে বোঝা যায়, ওয়াইল্ডবেরিজের সংকট এখন শুধু একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রুশ ভোক্তা বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

গুদাম ধ্বংস, পণ্য হারিয়ে বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

ওয়াইল্ডবেরিজের সংকটের সবচেয়ে সরাসরি শিকার হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছোট ব্যবসায়ীরা।

৪৪ বছর বয়সী কাটেরিনা কোরদিক এশিয়া থেকে তৈরি পোশাক ও অলংকার এনে ওয়াইল্ডবেরিজের মাধ্যমে বিক্রি করতেন। ব্যবসা ভালো চলায় পাঁচ সদস্যের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারতেন তিনি।

কিন্তু গত মাসে মস্কোর কাছে ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামে ইউক্রেনের হামলায় তাঁর মজুত পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল হাতে তৈরি অলংকার।

অন্য একটি গুদামে তাঁর আরও পণ্য রাখা ছিল। কিন্তু ওয়াইল্ডবেরিজের বিভিন্ন গুদামে একের পর এক হামলা চলতে থাকায় সেগুলোও সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

চলতি সপ্তাহে মস্কোর দক্ষিণে তুলা শহরের একটি ওয়াইল্ডবেরিজ গুদামেও হামলা হয়। এতে কোরদিকের আরও প্রায় অর্ধেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়।

প্রায় দুই হাজার পণ্যের মধ্যে এখন তাঁর বিক্রির জন্য মাত্র ১০০টি পণ্য অবশিষ্ট আছে।

পরিস্থিতির মানসিক চাপ এতটাই বেড়েছে যে জীবনে প্রথমবারের মতো তাঁকে মনোরোগ চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হয়েছে।

কোরদিকের অভিজ্ঞতা যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। সামরিক স্থাপনায় হামলার মতো সরাসরি যুদ্ধক্ষতির পাশাপাশি সাধারণ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ভোক্তারাও ধীরে ধীরে এর মূল্য দিচ্ছেন।

কর্মীদের মধ্যেও বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা

ওয়াইল্ডবেরিজের কর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রতিষ্ঠানটির ২৪ বছর বয়সী এক কর্মী নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর এলাকায় ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে ড্রোন হামলার সময় তিনি তীব্র আতঙ্কের মধ্যে পড়েছিলেন।

তিনি যে গুদামে কাজ করতেন, সেখানে এবং তাঁর বাড়ির কাছের আরেকটি গুদামে হামলার পর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অথচ কাজটি তিনি পছন্দ করতেন।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যবসায়িক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অর্থ শুধু পণ্য বা ভবন ধ্বংস হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো কর্মীর নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্ন।

প্রতিদ্বন্দ্বী ওজনে চলে যাচ্ছেন বিক্রেতারা

ওয়াইল্ডবেরিজের সংকটের সুযোগ নিচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীরাও।

ই-কমার্স খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াইল্ডবেরিজের অনেক বিক্রেতা এখন রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম ওজনে চলে যাচ্ছেন।

ওজনের সরবরাহব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তৃত ও বিকেন্দ্রীভূত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত ইউক্রেন ওয়াইল্ডবেরিজের মতো করে ওজনের স্থাপনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি।

ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ওয়াইল্ডবেরিজের জন্য প্রতিযোগিতামূলক চাপ আরও বাড়তে পারে।

তবে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক কর্মকর্তা মনে করেন, কয়েকটি গুদাম ধ্বংস হলেই ওয়াইল্ডবেরিজ পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে না। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির পণ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে এতটাই শক্তিশালীভাবে গড়ে উঠেছে যে বিকল্প পথে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এখনো রয়েছে।

রাশিয়ার অর্থনীতির ওপরও বাড়ছে চাপ

ওয়াইল্ডবেরিজের ওপর হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন রাশিয়ার অর্থনীতি নিজেই যুদ্ধের ব্যয়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, শ্রমিক সংকট ও সরবরাহব্যবস্থার নানা সমস্যার মুখোমুখি।

ইউক্রেন গত কয়েক মাসে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে।

এখন বেসরকারি খাতের বড় একটি ভোক্তা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোতেও হামলা বাড়ায় অর্থনৈতিক চাপের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

ইউক্রেনের কৌশলটির পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রুশ সমাজের দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের প্রভাব আরও দৃশ্যমান করতে চাইছেন। ধারণাটি হলো, যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যত বাড়বে, রুশ সমাজে অসন্তোষও তত বাড়তে পারে এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর যুদ্ধ শেষ করার চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

কারণ, ইউক্রেনে রাশিয়ার চালানো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের তুলনায় ওয়াইল্ডবেরিজের ক্ষয়ক্ষতি এখনো অনেক কম। পাশাপাশি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা রুশ জনগণের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব তৈরি করবে, নাকি উল্টো জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও শক্তিশালী করবে—তা নিশ্চিত নয়।

কিমের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

৫০ বছর বয়সী তাতিয়ানা কিম ইতিমধ্যে একাধিক সংকট মোকাবিলা করে রাশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন। সাবেক স্বামীর সঙ্গে ভয়াবহ ব্যবসায়িক বিরোধ, মস্কোর কার্যালয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং পরবর্তী বিবাহবিচ্ছেদের পরও তিনি ওয়াইল্ডবেরিজকে টিকিয়ে রেখেছেন।

কিন্তু এবার চ্যালেঞ্জটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এবার প্রতিপক্ষ একজন ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী নন; যুদ্ধরত একটি রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। আর লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে এমন এক সরবরাহব্যবস্থা, যার ওপর লাখো ক্রেতা ও হাজারো ব্যবসায়ী নির্ভরশীল।

ইউক্রেনের হামলা কত দিন চলবে, রুশ সরকার কতটা সহায়তা দেবে এবং তাতিয়ানা কিম কত দ্রুত বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে পারবেন—এসব প্রশ্নের ওপর ওয়াইল্ডবেরিজের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।

একই সঙ্গে তাঁকে মোকাবিলা করতে হবে বিক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি। যেসব ব্যবসায়ী বারবার পণ্য হারাচ্ছেন, তাঁদের জন্য অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সরকার যদি ওয়াইল্ডবেরিজকে কৌশলগত ভোক্তা অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে আরও বড় সহায়তা দেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে ওয়াইল্ডবেরিজের ওপর হামলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। যুদ্ধ এখন আর শুধু সীমান্ত, সামরিক ঘাঁটি বা তেল স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত পৌঁছে যাচ্ছে অনলাইন কেনাকাটা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

তাতিয়ানা কিমের সাম্রাজ্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, তা এখন শুধু একজন ধনী ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত ভাগ্যের প্রশ্ন নয়। এটি রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতি কতটা স্থিতিস্থাপক এবং ইউক্রেনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল কতটা কার্যকর—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স