ঢাকা

ভয়াবহ ভূমিকম্পে কলম্বিয়ায় নিহত ১১১, চলছে উদ্ধার অভিযান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি রিসারালদায়, ২১টি আফটারশকের পর আরও কম্পনের সতর্কতা

কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১১১ জনে দাঁড়িয়েছে। ৭ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পে বেশ কয়েকটি এলাকায় ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে জোরালো অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

সোমবারের ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন—এমন আশঙ্কায় উদ্ধারকর্মীরা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছেন।

দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার এলাকার কাছাকাছি। ওই অঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম জনবসতিপূর্ণ হওয়ায় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের আশপাশে প্রাণহানি তুলনামূলক কম হয়েছে।

তবে ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কফি চাষের জন্য পরিচিত রিসারালদা প্রদেশে। বিশেষ করে দোসকেব্রাদাস এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

ক্যালিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে বড় শহর ক্যালিতেও। সেখানে বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে শহরটির প্রশাসন নতুন করে কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি।

ভূমিকম্পের সময় শহরটির বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই নিরাপদ স্থানে চলে যান। বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে ভবন থেকে বের হয়ে খোলা জায়গায় অবস্থান করতে দেখা যায়।

ক্যালির এক নারী স্থানীয় একটি টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, ফোনে গুগলের ভূমিকম্প সতর্কবার্তা পাওয়ার পর তাঁরা দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়ায় তাঁরা প্রাণে বেঁচে গেলেও অনেক মানুষ সময়মতো ভবন থেকে বের হতে পারেননি।

যেকোনো সময় এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

একুশ শতকের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানিয়েছে, এটি একুশ শতকে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।

মূল ভূমিকম্পের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সোমবার দিনশেষে আরও ২১টি আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন অনুভূত হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিক সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সামনে আরও কম্পন অনুভূত হতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ এবং উদ্ধার তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

আফটারশকের কারণে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ভবন ও স্থাপনাগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর নিরাপত্তা যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গভীরে উৎপত্তি হলেও এত বেশি ক্ষতি কেন

কলম্বিয়ায় প্রতি মাসেই হাজার হাজার ছোটখাটো ভূমিকম্প অনুভূত হয়। দেশটির ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে ভূমিকম্প সেখানে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে এবারের ভূমিকম্পের মাত্রা এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ সুজান ভ্যান ডার লি জানান, এবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তি পৃথিবীর ভূত্বকের অনেক গভীরে হয়েছিল।

সাধারণত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল যত গভীরে হয়, ভূপৃষ্ঠে তার কম্পনের প্রভাব ততটা তীব্র হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এবারের ভূমিকম্পের মাত্রা অনেক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নদীর তীরবর্তী নরম মাটি এবং ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ভূমিকম্পের কম্পন অনেক বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। এর ফলে অপেক্ষাকৃত দূরের এলাকাতেও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণহানি বেড়েছে।

১৯৯৯ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি

কলম্বিয়ার কফি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এলাকায় এর আগেও ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল।

১৯৯৯ সালে আরমেনিয়া ও পেরেইরা এলাকায় ৬ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওই ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

সেই দুর্যোগের দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবারও কফি অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পুরোনো আতঙ্ক ফিরে এসেছে।

এবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ১৯৯৯ সালের ভূমিকম্পের চেয়ে বেশি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে এবার উদ্ধার ও জরুরি সেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা আগের তুলনায় কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে, তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উদ্ধারকাজে অগ্রাধিকার ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষ

ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করা। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধান করছেন।

প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে থাকলে দ্রুত তাঁদের কাছে পৌঁছানোই এখন উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য।

একই সঙ্গে আফটারশকের আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকর্মীদেরও বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল ভবনে উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় নতুন করে ধসের ঝুঁকি থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

নতুন সরকারের শুরুতেই বড় দুর্যোগ

কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্ডো দে লা এসপ্রিয়েলা শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় দেশটিতে এই বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানল।

নতুন সরকারের জন্য তাই ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

৭ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। আফটারশকের সতর্কতার মধ্যে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরীক্ষা ও দুর্গতদের সহায়তায় কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।

কলম্বিয়ার জন্য এই ভূমিকম্প শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নয়; দেশটির ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে দুর্যোগ প্রস্তুতি, ভবনের নিরাপত্তা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এনেছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স