ঢাকা

সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ছাত্রদল নেতার মৃত্যু, নরসিংদীতে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগ, আগের মামলা হত্যা মামলায় রূপান্তরের কথা পুলিশের

নরসিংদীর পলাশে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন ছাত্রদল নেতা ইব্রাহীম মাসুম (৩৬) মারা গেছেন। সংঘর্ষের নয় দিন পর সোমবার সকাল নয়টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

গত ১ আগস্ট দিবাগত রাতে সংঘর্ষের সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হন ইব্রাহীম। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে তাঁর শরীর থেকে একটি গুলি বের করা হয়েছিল। পরে তাঁকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।

ইব্রাহীম মাসুম পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। নতুন কমিটিতে তিনি সভাপতি পদপ্রার্থী ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ইব্রাহীমের মৃত্যুর ঘটনায় আগে করা মারধরের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আধিপত্য ও বালু ব্যবসা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাঙ্গা ইউনিয়নে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছিল।

এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মামুন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন এবং ছাত্রদল নেতা ইব্রাহীম মাসুম। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোমান মিয়া।

স্থানীয়ভাবে রোমান মিয়ার পক্ষের কর্মী হিসেবে শাহ আলম, আওলাদ, মহসিন, সানি ও সবুজের নাম বলা হচ্ছে। তবে সংঘর্ষ ও মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যেকের বক্তব্য আলাদাভাবে পাওয়া যায়নি।

এই বিরোধের জেরে গত ১ আগস্ট ডাঙ্গা ইউনিয়নে উত্তেজনা তৈরি হয়।

বাজারে আটকে হুমকির অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও মামলার নথি অনুযায়ী, ১ আগস্ট বিকেলে স্থানীয় একটি বাজারে ইব্রাহীম মাসুমকে আটকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিপক্ষের কর্মী শাহ আলমের বিরুদ্ধে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে মারামারি হয়। পরে উভয় পক্ষ এলাকায় মিছিল বের করে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। দিনের এই উত্তেজনার পর রাতে পরিস্থিতি আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই দিন রাত দেড়টার দিকে ডাঙ্গা ইউনিয়নের ফকিরবাড়ি এলাকায় একটি মুদিদোকানের সামনে মামুন আহমেদ, জয়নাল আবেদীন, ইব্রাহীম মাসুমসহ ১২ থেকে ১৩ জন অবস্থান করছিলেন।

এ সময় রোমান মিয়ার পক্ষের লোকজন আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

পেটে গুলিবিদ্ধ ইব্রাহীম

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, হামলার সময় ইব্রাহীম মাসুম পেটে গুলিবিদ্ধ হন। একই ঘটনায় মামুন আহমেদ, জয়নাল আবেদীনসহ অন্তত ১০ জন মারধরের শিকার হন।

হামলার একপর্যায়ে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গুরুতর আহত ইব্রাহীমকে পরে স্থানীয় লোকজন ও স্বজনেরা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ওই রাতেই তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে একটি গুলি বের করা হয়।

সংঘর্ষে আহত অন্য ব্যক্তিদের নরসিংদী ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা

ঘটনার পর ইব্রাহীম মাসুমের শ্যালক মো. মহসিন ৪ আগস্ট রাতে পলাশ থানায় মামলা করেন। মামলাটি মারধরের অভিযোগে করা হয়েছিল।

মামলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে হামলা, মারধর ও গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলোর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তবে মামলায় যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

নয় দিন চিকিৎসার পর মৃত্যু

ইব্রাহীম মাসুমের পরিবারের সদস্যরা জানান, রোববার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে সোমবার সকালে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।

সোমবার সকাল নয়টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

পরিবারের সদস্যদের কাছে ইব্রাহীমের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। তিনি ডাঙ্গা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সহসভাপতি ছিলেন এবং নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আগের মামলা হত্যা মামলায় রূপান্তর হবে

পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহেদ আল মামুন জানান, ইব্রাহীম মাসুমের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ইব্রাহীমকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনায় আগে যে মামলা করা হয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। সংঘর্ষের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসবে।

ইব্রাহীম মাসুমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ১ আগস্টের ওই সংঘর্ষের ঘটনা নতুন মাত্রা পেল। স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ হয়ে এক নেতার নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স