ঢাকা

‘রাতের আঁধারে আঁতাত মেনে নেব না’—মাফিয়া ব্যবসায়ীদের নিয়ে এনসিপির হুঁশিয়ারি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ খাত কোনোভাবেই কথিত মাফিয়া বা লুটেরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

দলটি অভিযোগ করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ একটি বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে দলটি।

সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন এসব কথা বলেন। তাঁদের পক্ষে বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা।

বিবৃতিতে বর্তমান বিএনপি সরকারকে সতর্ক করে এনসিপি বলেছে, ‘মাফিয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে আঁতাত কিংবা জনগণের সম্পদ নিয়ে যেকোনো গোপন রফা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।’ একই সঙ্গে দলটি কথিত বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া বাতিল করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

জ্বালানি খাতে ‘মাফিয়া নিয়ন্ত্রণের’ অভিযোগ

এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি জ্বালানি খাত। এই খাতকে একটি কথিত মাফিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আইনি বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন উপেক্ষা করে একটি বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে জাতীয় পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার উদ্যোগের তথ্য উঠে এসেছে।

এনসিপির দাবি, ওই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা বা আইনি নিষ্পত্তি সম্পর্কে বিবৃতিতে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে দলটির অভিযোগ, এমন একটি গোষ্ঠীকে দেশের কৌশলগত জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার উদ্যোগ জাতীয় স্বার্থের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, দেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো ধরনের চক্রান্ত করা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।

‘পুরোনো মডেলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে’

এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা আগের সরকারের সময়ের নীতিরই পুনরাবৃত্তি।

বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁদের অভিযোগ, সেই একই ধরনের ব্যবস্থা আবারও চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এনসিপির বিবৃতিতে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দায়মুক্তি আইনের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। দলটির অভিযোগ, ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে এবং এর একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

দলটির দাবি, বিদ্যুৎ খাতের পর এবার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্বালানি খাতকেও একই ধরনের ব্যবসায়িক স্বার্থের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

তদন্ত ও নীতিমালা প্রণয়নে তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মাত্র দুই দিনের সময়সীমা দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে অপসারণ এবং মাত্র চার দিনের মধ্যে নীতিমালার খসড়া তৈরির মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে বিষয়টি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়।

এনসিপির ভাষ্য, এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দলটি বলেছে, আমদানিনির্ভর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাতে বিপিসির নিজস্ব শোধন, সংরক্ষণ ও বিপণন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো বেসরকারি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়া হলে তা জনস্বার্থবিরোধী হবে।

এনসিপির মতে, জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

এলপিজির উদাহরণ টেনে সমালোচনা

বিবৃতিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি খাতের উদাহরণও তুলে ধরেছে এনসিপি।

দলটির অভিযোগ, এলপিজি খাত বেসরকারি আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ক্ষেত্রে এক ধরনের নির্ভরশীলতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।

এনসিপির আশঙ্কা, একই ধরনের ব্যবস্থা ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির ক্ষেত্রেও তৈরি করা হলে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা একটি সীমিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।

দলটির ভাষায়, এর ফলে জনগণকে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ফেরানোর দাবি

এনসিপি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছে।

দলটির মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন অংশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনগণের জীবনযাত্রা একই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এ কারণে বিপিসির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।

‘গণ–আন্দোলন গড়ে চক্রান্ত রুখে দেওয়া হবে’

জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে এনসিপি। একই সঙ্গে দলটি সতর্ক করে বলেছে, জনগণের অধিকার ও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস মেনে নেওয়া হবে না।

বিবৃতিতে এনসিপি বলেছে, জনগণের সম্পদ নিয়ে গোপন সমঝোতা কিংবা কথিত মাফিয়া তোষণের কোনো উদ্যোগ বন্ধ না হলে তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলবে।

দলটির ভাষায়, ‘জনগণের অধিকার ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে মাফিয়া তোষণের এই নগ্ন চক্রান্ত অবিলম্বে বন্ধ না করা হলে, দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে তীব্র গণ–আন্দোলন গড়ে তুলে তা রুখে দেওয়া হবে।’

এনসিপির এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বেসরকারি অংশগ্রহণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিয়ে দলটির অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। দলটি কৌশলগত জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স