ঢাকা

যুদ্ধ কতটা বদলে দিয়েছে ইরানিদের জীবন, বিবিসির সাংবাদিকের চোখে সেই বাস্তবতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক স্থাপনা, বন্দর কিংবা কৌশলগত অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর গভীর ছাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন, পরিবার, অর্থনীতি, মানসিকতা ও রাজনৈতিক আচরণেও। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং রাজধানী তেহরানের জনসমাগম—সবখানেই যুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখতে পেয়েছেন বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফি।

বিবিসির ‘গ্লোবাল আই’-এর জন্য করা তাঁর ইরান সফরের প্রতিবেদনটি পরে দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেখা যায়, যুদ্ধ ইরানের মানুষের কাছে একক কোনো অর্থ বহন করছে না। কারও কাছে এটি জাতীয় ঐক্যের কারণ, কারও কাছে গভীর শোক ও ধ্বংসের প্রতীক, আবার কারও কাছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তোলা একটি নতুন অধ্যায়।

তেহরান থেকে দক্ষিণের বন্দর আব্বাস, সেখান থেকে মিনাবের ধ্বংসস্তূপ—এই দীর্ঘ যাত্রায় যুদ্ধকবলিত ইরানের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা।

ধ্বংসস্তূপে মিলল আট বছরের শিশুর খাতা

দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার পাঁচ মাস পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। একটি খননযন্ত্র হঠাৎ থেমে গেলে এক শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করে আনেন। সেটি ছিল একটি শিশুর খাতা।

খাতাটির পাতাগুলো তখনো অক্ষত। ভেতরে পরিপাটি হাতের লেখা। প্রচ্ছদে লেখা ছিল একটি নাম—মাহিয়া সালারি। বয়স মাত্র আট বছর।

বিদ্যালয়টিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও একজন শিশুর মরদেহ চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা এখনো সেই মরদেহের সন্ধান করছেন।

মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ওই বিদ্যালয়ে ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু।

শহরের দেয়াল, দোকানের শাটার এবং রাস্তার পাশের বিলবোর্ডে এখনো নিহতদের ছবি টাঙানো। ফলে মিনাব যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়ের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

‘এটিকে আর স্কুল বলা যায় না’

শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয় বছর ধরে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষকতা করেছেন আমাইনে নাদেমি। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর নিজের কর্মস্থলকে আর চিনতে পারেন না তিনি।

নাদেমির ভাষায়, ‘এটিকে আর স্কুল বলা যায় না। এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ ভেসে আসে।’

হামলার পর সন্তানদের খোঁজে বাবা-মায়েরা কীভাবে ছুটে এসেছিলেন, সেই স্মৃতিও এখনো তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি বলেন, প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল সবাই হয়তো বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছে। পরে বুঝতে পারেন, বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।

মাহিয়া সালারি হামলার দিন তাঁর ছোট ভাই আলীর সঙ্গে স্কুলে ছিল। হামলার কিছুক্ষণ আগে তাঁদের মা সন্তানদের নিয়ে যেতে বিদ্যালয়ে এসেছিলেন। কিন্তু হামলায় মাহিয়া, তাঁর ভাই ও মা—তিনজনই নিহত হন।

একই ঘটনায় নিজের নয় বছর বয়সী মেয়ে সেতায়েশকে হারিয়েছেন মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি। প্রায় প্রতিদিন তিনি মেয়ের কবরের কাছে যান।

হামলার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন সেখানে পৌঁছাই, তখন শুধু ধোঁয়া আর শিশুদের চুলের গন্ধ। আমি একটি হাত দেখেছিলাম। একটি পা দেখেছিলাম। তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।’

যুদ্ধের আগে থেকেই ক্ষোভে ছিল ইরান

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ইরান নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। বছরের শুরুতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ছিল সেই বিক্ষোভের অন্যতম কারণ।

বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয় সরকার। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত এবং আরও অনেকে নিখোঁজ হয়েছেন। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।

এরপর শুরু হয় যুদ্ধ।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশায় যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, যুদ্ধ তাঁদের অবস্থানেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একসময় সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া একজন বিক্ষোভকারী বলেন, তিনি যুদ্ধ মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে নয়।

তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করে না; এটি সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।

‘মানিয়ে নেওয়া ইরানিদের স্বভাবের মধ্যে রয়েছে’

তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী রাতের ট্রেনে যাত্রা করেছিলেন নওয়াল আল-মাগাফি। প্রায় ৯০০ মাইল বা ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার পথের এই রেলপথ ইরানের রাজনৈতিক কেন্দ্র তেহরানকে দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালির সঙ্গে যুক্ত করেছে।

পাহাড়, মরুভূমি এবং নাতাঞ্জ ও ফোর্দোর মতো পারমাণবিক স্থাপনার পাশ দিয়ে ট্রেনটি এগিয়ে যায়।

ট্রেনে ছিলেন শিক্ষার্থী, ফুটবলার, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পরিবারের সদস্য। যুদ্ধ তাঁদের প্রত্যেকের জীবনে ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

আইনজীবী আজাদেহ বলেন, যুদ্ধের প্রথম কয়েকটি দিন ছিল অত্যন্ত ভীতিকর। তবে এরপর মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, ‘মানিয়ে নেওয়া প্রত্যেক ইরানির স্বভাবের মধ্যে রয়েছে। আমরা আমাদের জীবন চালিয়ে নেওয়ার, দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখার এবং আশাবাদী থাকার চেষ্টা করেছি।’

তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর আচরণ বদলে যায়। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি ওই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

ট্রেনের ভেতরে এরপর দ্রুত আলোচনার বিষয় বদলে যায়। পরিবার, কাজ, জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবন নিয়ে কথা চলতে থাকে। কিন্তু রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেই মানুষ সতর্ক হয়ে যায়।

এতে বোঝা যায়, ইরানে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ এখনো অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ।

‘আমি ইরানকে ভালোবাসি, কিন্তু আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে’

ট্রেনের আরেক যাত্রী সেপিদেহ পেশায় রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ। রাজনৈতিক বিষয়ে তুলনামূলকভাবে খোলামেলা কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন তিনি।

সেপিদেহ বলেন, তিনি ইরানকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। কিন্তু একই সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন।

তাঁর কথায়, ‘আমি ইরানকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু যখন দেখি আমার তারুণ্য ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তখন চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকে না।’

এই বক্তব্য যুদ্ধের বাইরেও ইরানের তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের হতাশাকে সামনে আনে। অর্থনৈতিক সংকট, সীমিত সুযোগ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক তরুণের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধ সেই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঘরোয়া ফুটবলও থেমে গিয়েছিল

ট্রেনের একটি কামরায় ছিলেন দুই তরুণ ফুটবলার। কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ইরানের ঘরোয়া ফুটবল লিগ আবার শুরু হয়েছে। তাঁরা বাড়ি ফিরছিলেন।

যুদ্ধ তাঁদের কাছেও শুধু সামরিক হামলার স্মৃতি নয়; এটি ছিল স্বাভাবিক জীবন থেমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।

ফুটবলার আবদুল্লাহর কাছে সবচেয়ে গভীর স্মৃতি হয়ে আছে স্কুলে হামলা।

তিনি বলেন, ‘তারা শিশুভর্তি একটি স্কুলে হামলা করেছিল…তাদের বয়স ছিল ৭, ৮ ও ৯ বছর। পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল।’

এই হামলার পর শিশুদের জানাজায় মানুষের উপস্থিতি ও কান্নার দৃশ্য তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।

মিনাব এখন শোকের শহর

বন্দর আব্বাস থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার সড়কপথে মিনাব শহর। খেজুরগাছ এবং বৃহস্পতিবারের ব্যস্ত বাজারের জন্য পরিচিত এই শহর এখন যুদ্ধের স্মৃতিতে ভারী।

রাস্তার পাশে, ভবনের দেয়ালে এবং বাতির খুঁটিতে স্কুলে নিহত শিশুদের ছবি টাঙানো। শহরের প্রায় প্রতিটি অংশেই যুদ্ধের উপস্থিতি দৃশ্যমান।

শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আর কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই। কংক্রিটের মেঝে একটির ওপর আরেকটি ধসে পড়েছে। বিধ্বস্ত শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আছে বাঁকা লোহার রড। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ।

সেখানেই পাওয়া গেছে মাহিয়া সালারির খাতা।

স্কুলটির সঙ্গে সংযুক্ত একটি সামরিক স্থাপনায় হামলার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটি বিদ্যালয়ে আঘাত হানে বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য। তবে এ বিষয়ে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মী রেজা বেসারাতি বলেন, হামলার সেই সকালের দৃশ্য তিনি এখনো ভুলতে পারেননি।

মিনাব কি রাজনৈতিক বাঁকবদলের জায়গা?

যুদ্ধের আগে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কিছু মানুষের কাছেও মিনাবের ঘটনা রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের কারণ হয়েছে।

একজন সাবেক বিক্ষোভকারী বলেন, বাইরের চাপের মাধ্যমে সরকার দুর্বল হবে—এমন ধারণা আগে তাঁর ছিল। কিন্তু নিরপরাধ মানুষ নিহত হওয়ার পর সেই অবস্থান নিয়ে তিনি নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন।

তাঁর মতে, যুদ্ধ এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে সরকারবিরোধিতা ও দেশের বিরুদ্ধে বাইরের সামরিক হামলার বিরোধিতা—এই দুই অবস্থানকে অনেকে আলাদা করে দেখতে শুরু করেছেন।

মিনাবের কবরস্থানেও যুদ্ধের এই মানবিক মূল্য স্পষ্ট। সারিবদ্ধ ছোট ছোট কবরের মাঝ দিয়ে শিশুরা হাঁটছে। পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের কবরের পাশে বসে থাকছেন। কেউ কেউ দুপুরের তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে কবরস্থানের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বন্দর আব্বাসের অচলাবস্থা

মিনাবের পশ্চিমে বন্দর আব্বাস। এটি ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দর এবং হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই সামুদ্রিক পথ শুধু ইরানের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বন্দর আব্বাসে ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনী এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে। এ কারণে যুদ্ধের সময় শহরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে বন্দর আব্বাস ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

সেখানে পৌঁছে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় জেলেদের নোঙর করে রাখা পণ্যবাহী জাহাজের আশপাশে কাজ করতে দেখা যায়। এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অপেক্ষায় ছিল।

দীর্ঘ অচলাবস্থায় অনেক মানুষের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতও সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে গিয়ে পড়েছে।

তেহরানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য

দক্ষিণাঞ্চলের ধ্বংসস্তূপ ও বন্দরকেন্দ্রিক অচলাবস্থার পর তেহরানে গিয়ে নওয়াল আল-মাগাফি এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন।

যুদ্ধের মধ্যে তখন সাময়িক বিরতি চলছিল। এই সময় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জানাজায় কয়েক মিলিয়ন মানুষ অংশ নেন।

তেহরানের রাস্তাজুড়ে খামেনির ছবি, মাইকে বিপ্লবী সংগীত এবং মানুষের মুখে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ স্লোগান শোনা যায়।

এই আয়োজন ছিল একই সঙ্গে শোক প্রকাশ এবং রাজনৈতিক ঐক্য প্রদর্শনের একটি বড় মঞ্চ।

জীবনে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়া সুরাইয়া বলেন, তাঁর পরিচিত এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা আগে সরকারের বিরোধিতা করতেন। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তাঁরাও সরকারকে সমর্থন করছেন।

তবে একজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো ইরানের জনমতের অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

যুদ্ধ কি জাতীয় ঐক্য বাড়িয়েছে?

ইরানে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে একক কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বয়ান তৈরি হয়নি।

একটি অংশ মনে করছে, বাইরের সামরিক হামলা জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করেছে। অন্য অংশ মনে করছে, যুদ্ধ সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে পারে।

তবে একটি বিষয়ে প্রায় সব পক্ষের অভিজ্ঞতায় মিল রয়েছে—যুদ্ধের আগে যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, যুদ্ধ সেই সমস্যার সমাধান করেনি।

বরং নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

ধ্বংসস্তূপ থেকে তেহরান—এক বদলে যাওয়া ইরান

মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ, নিহত শিশুদের ছোট ছোট কবর, বন্দর আব্বাসের স্থবির বাণিজ্যিক কার্যক্রম, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব এবং তেহরানের বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশ—সব মিলিয়ে ইরানের যুদ্ধকালীন বাস্তবতার একটি বহুমাত্রিক ছবি পাওয়া যায়।

একদিকে আছে সন্তান হারানো পরিবারের অসহনীয় শোক। অন্যদিকে আছে যুদ্ধের মধ্যেও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ক্রীড়াবিদেরা। কেউ দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন, কেউ আবার যুদ্ধের মধ্যেই জাতীয় ঐক্যের নতুন অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধ ইরানের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে মুছে দেয়নি। বরং আগের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

যুদ্ধ এখনো চলমান। তাই এই সংঘাতের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার কী হবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

মিনাবের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা আট বছরের মাহিয়া সালারির খাতা যেন সেই প্রশ্নেরই প্রতীক—যুদ্ধের পর একটি দেশের পুনর্গঠন শুধু ভবন ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্মের স্মৃতি, পরিবারের শোক, মানুষের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে পথ খোঁজার সংগ্রাম।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স