ঢাকা

জলবায়ু ও অঞ্চল বিবেচনায় গাছের প্রজাতি নির্ধারণে কাজ চলছে: পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি, জলবায়ু ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে কোন এলাকায় কোন প্রজাতির গাছ সবচেয়ে উপযোগী হবে, তা নির্ধারণে ম্যাপিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে পরিবেশ ও স্থানীয় প্রতিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। এ লক্ষ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য উপযোগী গাছের প্রজাতি নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদারের লক্ষ্যে দুই দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিথ্রিইআর) এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস এবং ২৮ জুলাই বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস পালিত হয়। এ দুই দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি সংরক্ষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ

অনুষ্ঠানে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ চলছে। তবে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে শুধু গাছের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে উপযোগী গাছের প্রজাতি নির্ধারণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে ম্যাপিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কোন অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু কোন ধরনের গাছের জন্য বেশি উপযোগী, সেই অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনা সাজানো হবে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগানো হলে বৃক্ষরোপণের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। একই সঙ্গে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাটির গুণাগুণ রক্ষা, জলাধার ও জলাভূমির পরিবেশ বজায় রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবেশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের নেতৃত্বের আহ্বান

অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও ভূপ্রকৃতির দিক থেকেও দেশটির রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত এবং বৃহত্তম গভীর সমুদ্র সাবমেরিন ফ্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি বলেন, এসব প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে হবে।

উপাচার্যের বক্তব্যে পরিবেশ রক্ষায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে পরিবেশগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কাজে লাগানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

অনুষ্ঠানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, গবেষক ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

বিশেষ করে বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশ বিষয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সিথ্রিইআরের উপদেষ্টা অধ্যাপক আইনুন নিশাত, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. সাইমুম পারভেজ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

বক্তারা পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। তাই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ

দুই দিনব্যাপী আয়োজনে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্ব ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগকে শুধু দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। গবেষণা ও বাস্তবভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে পরিবেশগত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা আরও বাড়বে।

পরিবেশ সংরক্ষণে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ আরও জোরদার এবং একটি টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন শেষ হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য উপযোগী গাছের প্রজাতি নির্ধারণে চলমান ম্যাপিং এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাই উঠে আসে অনুষ্ঠানে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স