ঢাকা

কৈলাস–মানস সরোবর: মানুষের এত আকর্ষণের কারণ কী, কোন পথে যাত্রা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের রাসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে কৈলাস–মানস সরোবর তীর্থযাত্রা। এই দুর্যোগে কৈলাস–মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রীদের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের নাগরিক ও তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।

কৈলাস–মানস সরোবর শুধু একটি দুর্গম পাহাড়ি ভ্রমণপথ নয়; হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থান। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের হাজারো মানুষ দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তিব্বতের এই অঞ্চলে যান।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ কৈলাস–মানস সরোবর

তিব্বতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত কৈলাস পর্বত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে এই পর্বতকে দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই বহু হিন্দুর কাছে কৈলাস দর্শন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা।

কৈলাসের কাছেই রয়েছে মানস সরোবর। হিন্দুদের কাছে এটি একটি পবিত্র হ্রদ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই হ্রদের পবিত্র পানিতে স্নান করলে পাপমুক্তি ঘটে এবং মোক্ষ লাভের পথ সুগম হয়।

হিন্দুধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মেও কৈলাস ও মানস সরোবরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে এটি একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি অনন্য তীর্থস্থান।

কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রার ইতিহাসও বহু পুরোনো। হিন্দু পুরাণ, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও জৈন ধর্মীয় বিশ্বাসে এই অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। ফলে হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এই স্থানটি ধর্মীয় সাধনা ও তীর্থযাত্রার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়।

যুদ্ধের পর বন্ধ, আবার শুরু

কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রা সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের যুদ্ধের পর প্রায় দুই দশক এই তীর্থযাত্রা বন্ধ ছিল।

পরে দুই দেশের মধ্যে চুক্তির পর ১৯৮১ সালে আবার যাত্রা শুরু হয়। এরপর করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সাল থেকে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।

প্রায় ছয় বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে আবার কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রা শুরু হয়। এর ফলে দীর্ঘ বিরতির পর ভারতসহ বিভিন্ন দেশের তীর্থযাত্রীদের মধ্যে এই যাত্রা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।

তীর্থযাত্রীরা কোন কোন পথে যান

কৈলাস–মানস সরোবর যাওয়ার প্রধান তিনটি পথ রয়েছে। এর দুটি ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে এবং অন্যটি নেপাল হয়ে তিব্বতে প্রবেশ করে।

লিপুলেখ পাস: উত্তরাখন্ডের পথ

প্রথম পথটি হলো ভারতের উত্তরাখন্ডের লিপুলেখ পাস রুট। দিল্লি থেকে যাত্রা শুরু করে তীর্থযাত্রীরা আলমোড়া ও ধারচুলা হয়ে গুঞ্জি এলাকায় যান। এরপর প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতার লিপুলেখ পাস অতিক্রম করে তিব্বতে প্রবেশ করেন।

এই যাত্রা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও উত্তরাখন্ড সরকারের অধীন কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগমের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়।

ঐতিহ্যগতভাবে এই পথে দীর্ঘ সময় হেঁটে যেতে হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক যোগাযোগের উন্নতির ফলে সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারপরও উচ্চতার কারণে এই পথের যাত্রা যথেষ্ট কঠিন।

নাথু লা: সিকিমের পথ

দ্বিতীয় পথটি ভারতের সিকিম দিয়ে। এই রুটে দিল্লি থেকে গ্যাংটক হয়ে নাথু লা পাস অতিক্রম করে তিব্বতে প্রবেশ করতে হয়।

লিপুলেখের তুলনায় এ পথে গাড়িতে যাতায়াতের সুযোগ বেশি। ফলে দীর্ঘ সময় পাহাড়ি পথে হাঁটার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে বয়স্ক তীর্থযাত্রীদের জন্য নাথু লা রুট কিছুটা সুবিধাজনক বলে বিবেচিত হয়।

তবে পুরো যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে।

কাঠমান্ডু: নেপাল হয়ে তিব্বত

তৃতীয় ও বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত পথটি হলো নেপালের কাঠমান্ডু রুট। এ পথটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটরদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

তীর্থযাত্রীরা কাঠমান্ডু থেকে উড়োজাহাজ বা সড়কপথে নেপালগঞ্জ অথবা সিমিকোটের দিকে যান। এরপর হিলসা কিংবা অন্য কোনো স্থলপথ দিয়ে তিব্বতে প্রবেশ করেন।

এই পথের অন্যতম সুবিধা হলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘ সময় হেঁটে যাওয়ার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। কিছু অংশে হেলিকপ্টার ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল হয়ে তিব্বতে যাওয়ার এই রুটের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কেন এত কঠিন এই তীর্থযাত্রা

কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চতা। পুরো যাত্রাপথের বড় একটি অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত।

এত বেশি উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে পর্যাপ্ত শারীরিক সক্ষমতা না থাকলে তীর্থযাত্রীরা শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হতে পারেন।

এর সঙ্গে রয়েছে প্রচণ্ড ঠান্ডা, হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন, তুষারপাত, ভূমিধস এবং দুর্গম পাহাড়ি পথ।

তবে যাত্রার সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি হলো কৈলাস পর্বতকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করা। এই প্রদক্ষিণকে বলা হয় পরিক্রমা বা কোরা।

কৈলাসের চারপাশে এই পরিক্রমার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫২ কিলোমিটার। পথে তীর্থযাত্রীদের প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিটার উচ্চতার দোলমা লা পাস অতিক্রম করতে হয়।

এ কারণে কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের পরীক্ষা নয়, অনেকের জন্য এটি শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তারও বড় পরীক্ষা।

কী কী নথিপত্র প্রয়োজন

কৈলাস–মানস সরোবর যেতে হলে সাধারণ পর্যটন ভ্রমণের মতো শুধু পাসপোর্ট ও ভিসা থাকলেই হয় না। তিব্বতে প্রবেশের জন্য চীনের ভিসার পাশাপাশি তিব্বত গ্রুপ ভিসা এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতিপত্র প্রয়োজন হয়।

এসব অনুমতিপত্র সাধারণত অনুমোদিত ট্যুর অপারেটর বা সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়া করতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে এককভাবে তিব্বতের এই অঞ্চলে গিয়ে কৈলাস–মানস সরোবর ভ্রমণের সুযোগ নেই।

ভারত সরকারের ব্যবস্থাপনায় যাঁরা যাত্রা করেন, তাঁরা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করেন। সাধারণত আবেদনকারীদের ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সী হতে হয় এবং নির্ধারিত শারীরিক সক্ষমতার মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।

অন্যদিকে, নেপাল হয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাঁরা যান, তাঁদের যাত্রার বেশ আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হয়। সাধারণত পাসপোর্টের স্ক্যান কপি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের কাছে জমা দিতে হয়।

ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি কঠিন অভিযাত্রা

কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রার প্রতি মানুষের আকর্ষণের পেছনে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, রয়েছে একটি অনন্য অভিযাত্রার আকর্ষণও। বিশ্বের অন্যতম দুর্গম ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের এই যাত্রা শেষ করতে হয়।

তীর্থযাত্রীরা বরফঢাকা পাহাড়, দুর্গম উপত্যকা, হিমবাহ, পাথুরে পথ ও উচ্চ পর্বত অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত কৈলাসের কাছে পৌঁছান। অনেকে সেখানে প্রার্থনা করেন, মানস সরোবরে পূজা ও স্নান করেন এবং কৈলাস পর্বতকে ঘিরে পরিক্রমা সম্পন্ন করেন।

সাম্প্রতিক নেপাল–তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ দুর্যোগ অবশ্য এই যাত্রার ঝুঁকির দিকটিও সামনে এনেছে। পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, হিমবাহ ও পাথরধস, আকস্মিক বন্যা এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রা এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি তীর্থযাত্রা।

তবু ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা এবং কৈলাস দর্শনের গভীর আকর্ষণে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স