ঢাকা

পাহাড়ধস থেকে বাঁচতে ‘শিশুর মতো হামাগুড়ি’, প্রাণে রক্ষা পেলেন তাঁরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিবিসি

নেপালে গত বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এক পরিবারের তিন ঘনিষ্ঠ সদস্যকে হারিয়েছেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ২৬ বছর বয়সী নেপালি যুবক বরুণ লামিছানে। প্রাণঘাতী এই দুর্যোগে তাঁর ভাই, চাচা ও এক চাচাতো ভাই মারা গেছেন। তবে তাঁর মা, বাবা ও দাদি শেষ মুহূর্তে প্রাণে বেঁচে গেছেন।

পরিবারের সদস্যদের বেঁচে যাওয়ার সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বরুণ জানিয়েছেন, প্রবল স্রোত ও ধ্বংসস্তূপ থেকে রক্ষা পেতে তাঁর মা, বাবা ও দাদি ‘শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে’ পাহাড়ের ঢালের দিকে এগিয়ে যান। এভাবেই তাঁরা ভয়াবহ বন্যার স্রোত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হন।

বরুণ বলেন, ‘সৌভাগ্যবশত তাঁরা বেঁচে আছেন।’

কিন্তু একই দুর্যোগে পরিবারের তিন সদস্যকে হারানোর বেদনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। স্বজনদের হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নেপালের উত্তরাঞ্চলে আকস্মিক এই দুর্যোগের পর এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে দেশটিতে অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৯০০ জনের বেশি মানুষ। প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

কয়েক মিনিটেই বদলে যায় সবকিছু

নেপালে দুর্যোগটি এত দ্রুত আঘাত হানে যে অনেক মানুষ আত্মরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময়ই পাননি। পাহাড়ি এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি ধসে নদীর পানির সঙ্গে মিশে যায়। এরপর সেই ধ্বংসাবশেষ ও পানি মিলে ভয়াবহ গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে।

বরুণের পরিবারের মতো বহু পরিবার আকস্মিক এই স্রোতের মুখে পড়ে। পাহাড়ি নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোতে মুহূর্তের মধ্যে পানি ও কাদার উচ্চতা বেড়ে যায়। ঘরবাড়ি, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষ স্রোতের সঙ্গে ভেসে যান।

বরুণের পরিবারের সদস্যদের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি সেই ভয়াবহতারই একটি চিত্র তুলে ধরে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য তাঁদের হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হয়েছে। প্রবল স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে বা স্বাভাবিকভাবে চলার সুযোগও ছিল না তাঁদের।

তিন স্বজনকে হারানোর বেদনা

দুর্যোগের পর বরুণ জানতে পারেন, তাঁর ভাই, চাচা ও এক চাচাতো ভাই আর বেঁচে নেই। একদিকে পরিবারের বাকি সদস্যদের বেঁচে যাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে তিন ঘনিষ্ঠ স্বজনকে হারানোর শোক—দুই বিপরীত অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।

মা, বাবা ও দাদির বেঁচে যাওয়াকে তিনি সৌভাগ্য হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা তাঁর কাছে অত্যন্ত গভীর। দুর্যোগের আকস্মিকতা এবং অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয় পরিবারের ওপর বড় ধরনের আঘাত হয়ে এসেছে।

নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এখনো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা। কেউ হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রে খোঁজ করছেন, কেউ নদীর তীরে অপেক্ষা করছেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ ও নদীতীরবর্তী এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।

কীভাবে এলো ভয়াবহ ঢল

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা—ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, পর্বত থেকে বরফ, পাথর ও মাটি ধসে নদীতে পড়ে এবং পানির সঙ্গে মিশে গেলে ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি হতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগেও এমন একটি প্রক্রিয়া কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পাহাড়ি এলাকায় বরফ ও পাথরের বড় অংশ ধসে নদীর প্রবাহে পড়ে। এতে নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হয়। সেই স্রোত নিচের দিকে নামার সময় আরও পাথর, মাটি ও কাদা সঙ্গে নিয়ে প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তা আকস্মিক বন্যার রূপ নেয়।

এই ধরনের দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় আকার ধারণ করতে পারে। ফলে নদীতীরবর্তী মানুষের হাতে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময় থাকে খুব কম।

এখনো কাটেনি শঙ্কা

দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে খাবার, পানি ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নদীর পানি ও পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বরুণ লামিছানের পরিবারের ঘটনা এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত শোক ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের একটি প্রতিচ্ছবি। একদিকে মা, বাবা ও দাদির প্রাণে বেঁচে যাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে ভাই, চাচা ও চাচাতো ভাইকে হারানোর শোক—এই দুইয়ের মাঝেই এখন তাঁর পরিবারকে সামনে এগোতে হচ্ছে

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স