ঢাকা

‘ফ্যাসিবাদী সরকারের’ সময়ে পুলিশে দলীয় নিয়োগ, সংসদে জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুলিশে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, তদন্তে কয়েকটি জেলায় পুলিশে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষ হলে এসব তথ্য প্রকাশ করা হবে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে কয়েকটি জেলায় হাজার হাজার পুলিশ কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই) এবং অন্যান্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগে জেলা কোটার সুবিধা নিতে অনিয়মের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জেলার বাসিন্দা না হয়েও অনেকে জেলা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার জন্য নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন। এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জসহ চার-পাঁচটি জেলা বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত

সংসদে পুলিশের নিয়োগের পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের অগ্রগতি নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সব বাহিনী সমন্বিতভাবে অস্ত্র উদ্ধারে তৎপর রয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পুলিশে বাড়ছে জনবল

রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ বাহিনীর জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, পুলিশের জনবল বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন করে ৪ হাজার নিরস্ত্র উপপরিদর্শক (এসআই), ৪০০ সার্জেন্ট এবং ১ লাখ কনস্টেবলের পদ সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরাধের ধরন পরিবর্তন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ওপর বাড়তে থাকা দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্টা জবাব

এদিকে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসনাত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন করেন। তিনি বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানতে চান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে কতটা সফল হয়েছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না, নাকি তিনি ব্যর্থ হয়েছেন—এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নটি সংসদীয় প্রশ্নের পরিবর্তে রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, নাকি পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।’

সংসদ সদস্যের দেওয়া অপরাধের পরিসংখ্যানের ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কোন খাতে কত হত্যা হয়েছে, জখম হয়েছে ইত্যাদি যে ডেটা দিলেন, সেই ডেটাটা কিসের ভিত্তিতে দিলেন, কী পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দিলেন, সে স্ট্যাটিস্টিকসটা কি আমি জানি না।’

তবে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে দাবি করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি হয়নি, সেটি তো দৃশ্যমান।’

‘২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার’

বর্তমান সরকারের সময়ে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা, ৪৮ ঘণ্টা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাত ঘণ্টার মধ্যেই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আলোচিত অপরাধের পাশাপাশি যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়নি, সেসব ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।

সুনির্দিষ্ট ব্যর্থতার তথ্য দিতে বিরোধী দলকে আহ্বান

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলে বিরোধী দলকে সুনির্দিষ্ট ঘটনা সংসদে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলে তা সংসদে উপস্থাপন করা যেতে পারে। সুনির্দিষ্ট ঘটনা তুলে ধরা হলে তিনি সেটির বিষয়ে সংসদের ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিতে পারবেন বলেও জানান।

এর মাধ্যমে সাধারণ অভিযোগের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ঘটনা ও তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

মব সহিংসতা ও সংখ্যালঘু-সম্পর্কিত ঘটনায় কমেছে সংখ্যা

সংসদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট এবং ২০২৬ সালের একই সময়ের তথ্য তুলনা করে জানান, মব বা সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ঘটনা ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে নেমে এসেছে।

একইভাবে সংখ্যালঘুদের ঘিরে সংঘটিত ঘটনার সংখ্যাও কমেছে বলে জানান তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৯৯৯। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৩টিতে।

এই পরিসংখ্যানকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘এটাকে একটি বৈপ্লবিক উন্নতি না বললেও আমি বলব দৃশ্যমান এবং জনপ্রত্যাশিত উন্নতি হয়েছে।’

কারখানা বন্ধের অভিযোগের প্রমাণ চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে দেশে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—বিরোধী দলের এমন অভিযোগেরও জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কোথায় কারখানা বন্ধ হয়েছে, কতগুলো কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং সেগুলো গ্যাসের সংকট নাকি বিদ্যুতের সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে—এসব তথ্যসহ সংসদে তুলে ধরতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, শুধু অভিযোগ করলেই হবে না; কারখানা বন্ধের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও কারণের তথ্য দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেল ও গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হয়নি বলে জানান তিনি।

নিয়োগ তদন্ত থেকে আইনশৃঙ্খলা—সংসদে একাধিক ইস্যু

বৃহস্পতিবারের সংসদীয় প্রশ্নোত্তর পর্বে পুলিশের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ থেকে শুরু করে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, পুলিশে নতুন পদ সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ঘিরে সংঘটিত ঘটনা এবং জ্বালানি সংকটে শিল্পকারখানা বন্ধের অভিযোগ—বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পুলিশে বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা কোটার অপব্যবহার ও স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে দাবি করে মব সহিংসতা ও সংখ্যালঘু-সম্পর্কিত ঘটনার পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছেন তিনি।

তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংসদে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন করে বিপুলসংখ্যক পদ সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স