ঢাকা

সংসদে বিরোধীদের প্রতিবাদ, ওয়াকআউট করে বেরিয়ে গেলেন এমপিরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
‘পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে খণ্ডিত সংস্কার চাইছে সরকার’

পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি উপেক্ষা করে সরকার খণ্ডিত ও আংশিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলসহ কয়েকটি সংস্কারসংক্রান্ত বিল সংসদে উত্থাপনের আগে বৃহস্পতিবার রাতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।

বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলি শুরুর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে বিরোধী দলের অবস্থান তুলে ধরেন।

শফিকুর রহমান বলেন, তাঁরা পূর্ণাঙ্গ সংস্কার চান এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে রয়েছেন। কিন্তু খণ্ডিতভাবে সংস্কারের কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে তাঁরা রাজি নন। এ কারণেই তাঁরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছেন।

১৩৩ অধ্যাদেশের প্রসঙ্গ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে বেশ কিছু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে ওই সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

বর্তমান সংসদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি বিল আকারে উত্থাপন করা হয়নি। ফলে সেগুলো কার্যকারিতা হারায়। এ ছাড়া সাতটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। সরকার তখন এসব আইন ও অধ্যাদেশ আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন করে বিল আনার কথা জানিয়েছিল।

বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর বক্তব্যে বলেন, অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুমের অভিযোগ তদন্ত এবং পুলিশ সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

শফিকুর রহমানের অভিযোগ, এসব মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে দেশকে পুরোপুরি মুক্ত করা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায় মানা তো হয়নি, উল্টো ১৩৩টা অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টা ল্যাপস (বাতিল) করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন—এসব মৌলিক বিষয় ছিল। এগুলো ঠিক না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে দেশ মুক্তি পাবে না।’

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে আপত্তি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ক্ষমতা দিয়ে একটি অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সংসদে উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে সেই ক্ষমতা রাখা হয়নি।

প্রস্তাবিত বিলে গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ওই বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না—এমন বিধান রাখা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অথবা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।

তবে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়েও বিতর্ক

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইন নিয়েও সরকারের প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ আপত্তি জানিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনঃপ্রচলনের জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিল পাস করা হয়েছিল। তখন সরকার আরও যাচাই-বাছাই করে কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য নতুন আইন করার কথা বলেছিল।

এরপর নতুন আইনের খসড়া অনুমোদন করা হলে মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা, কমিশন গঠনে বাছাই কমিটি তৈরির প্রক্রিয়া এবং কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অংশীজনদের একটি বড় উদ্বেগ হলো, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত করতে হলে কমিশনের যথেষ্ট স্বাধীনতা ও ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সেই স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়েই মূলত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

‘সংস্কারের মূল দাবিকে চাপা দেওয়া হচ্ছে’

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, দেশে নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি বিশেষ সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সে বিষয়ে তিনি কোনো জবাব পাননি।

বৃহস্পতিবার সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের সামনে এখন তিনটা বিল এসেছে। সেগুলো আজকে অবশ্য আলোচনা হবে না, উত্থাপনের জন্য এসেছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তার প্রক্রিয়াটা শুরু হবে।’

তাঁর অভিযোগ, বিলগুলো উত্থাপনের মাধ্যমে এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে সংস্কারের মূল দাবিগুলোকে ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হতে পারে।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখন আমরা দেখছি যে সেগুলো আস্তে আস্তে বিভিন্ন কায়দায় সরকারি দল এখানে নিয়ে আসছে।’

তাঁর আশঙ্কা, এভাবে খণ্ডিত সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশিত মৌলিক সংস্কারের বিষয়টি আড়ালে চলে যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি যে এর মাধ্যমে সংস্কারের যে মূল দাবি, সেটাকেই চাপা দেওয়া হয়। তো আমরা সেই চাপা দেওয়ার পক্ষে নাই। সংস্কারের মূল দাবির পক্ষে জোরালো ও স্পষ্ট অবস্থান আমাদের। আমরা এখান থেকে সরিনি।’

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ

সংস্কার প্রশ্নে বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ নির্বাচন অনুযায়ী এবং নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সংসদ আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়নি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গণভোটে দেওয়া জনগণের মতামত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বিরোধীদলীয় নেতা মনে করেন, গণভোটের রায় এবং নির্বাচনের ফলাফল একই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে কেবল নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সংসদ পরিচালনা করা হলে সংস্কারপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

‘সংসদকে একতরফা করা হচ্ছে’

বৃহস্পতিবার সংসদে বেসরকারি দিবস থাকা সত্ত্বেও যেভাবে একের পর এক সরকারি বিল উত্থাপন করা হচ্ছে, সেটিকে ভালো নজির হিসেবে দেখছেন না বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।

তিনি অভিযোগ করেন, সংসদকে একতরফা ও একপেশে করে পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল নীতিগতভাবে অংশ নিতে চায় না।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা পুরো সংস্কার চাই, আমরা গণভোটের বাস্তবায়ন চাই এবং আমরা এইভাবে খণ্ডিত কোনো প্রসেসের অংশ হতে চাই না।’

তাঁর মতে, সংস্কারকে কয়েকটি আলাদা আইনি পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া হিসেবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

তিনটি বিল নিয়ে আপত্তি

বৃহস্পতিবার সংসদে তিনটি বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

বিরোধী দলের অভিযোগ, এসব বিলের বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পরিবর্তে সরকার দ্রুত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে আইন পাস হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া সংস্কার উদ্যোগের মৌলিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে সরকার বলছে, বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও আইনি উদ্যোগকে আরও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে বিল আকারে সংসদে আনা হচ্ছে।

ওয়াকআউটের ঘোষণা

সংসদে নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা স্পষ্ট করে দেন, প্রস্তাবিত বিলগুলোর প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে না বিরোধী দল।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা পুরা সংস্কার চাই, আমরা গণভোটের বাস্তবায়ন চাই এবং আমরা এইভাবে খণ্ডিত কোনো প্রসেসের অংশ হতে চাই না, এই জন্য আমরা এখন আর এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করব না।’

এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ‘এই পর্বে আমরা সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমরা আবার ওয়াকআউট করছি।’

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।

সংস্কার নিয়ে সংসদে নতুন করে টানাপোড়েন

বিরোধী দলের এই ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারের উদ্যোগ যেখানে বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও সংস্কার প্রস্তাবকে যাচাই-বাছাই করে নতুন আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার দিকে, সেখানে বিরোধী দল চাইছে গণভোটের রায় ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিতে।

বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট আইন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বিরোধী দলের ওয়াকআউট সংসদীয় রাজনীতিতে সংস্কার ইস্যুটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিরোধী দলের অবস্থান হলো—বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিতভাবে কোনো সংস্কার নয়; বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার সুরক্ষা, গুমের অভিযোগের বিচার এবং পুলিশ সংস্কারসহ মৌলিক বিষয়গুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই দাবিতে আপাতত সংসদীয় কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট অংশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে তারা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স