জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আজকে যে উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এটা শাহবাগের প্রোডাক্ট। শাহবাগই ওনাকে আজকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে।’
বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করার পর সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। এ সময় তিনি সংসদে বিরোধী দলের প্রতি সরকারের আচরণ, উন্নয়ন বরাদ্দ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংসদে বিল পাসের প্রক্রিয়া নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বক্তব্যকে উপেক্ষা করার চেষ্টা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগেও বিভিন্ন মন্তব্যের মাধ্যমে করেছেন। বৃহস্পতিবারও তিনি একই ধরনের আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের এই নেতা।
তাহের বলেন, ‘আজকেও উনি এ রকম কথাই বলেছেন যে এগুলো পল্টন না, এটা শাহবাগ না। এটা ওনার মনে রাখা উচিত ছিল, আজকে যে উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এটা শাহবাগের প্রোডাক্ট। শাহবাগই ওনাকে আজকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে।’
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করলেও সংসদে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অসংসদীয় পরিবেশ তৈরি করতে চান না বলে জানান তিনি। তাহের বলেন, তাঁরা একটি ‘কালচারড’ ও ‘সিভিলাইজড’ সংসদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ কারণে বিরোধী দলের নেতারা নিজেদের বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু ওনার বক্তৃতার ব্যাপারে বহু কমেন্ট করতে পারি। কিন্তু আমরা যেহেতু একটি কালচারড, সিভিলাইজড একটা সংসদ তৈরি করার জন্য চেষ্টা করছি, সে জন্য আমরা সমালোচনা করি।’
বিরোধীদলীয় নেতাসহ জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভাষা ও বক্তব্যের ধরন নিয়ে সতর্ক থাকেন বলেও জানান তিনি।
‘বিএনপি বৈষম্যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাচ্ছে’
সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে বিএনপি সরকারের আচরণ নিয়েও অভিযোগ করেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তাঁর দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।
তাহের বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁরা লাখ লাখ ভোট পেয়ে সংসদে এসেছেন। কিন্তু সরকারের উন্নয়ন তহবিল থেকে তাঁদের এলাকায় যথাযথ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘যেসব ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থাকে সরকারের, এগুলো বিএনপি তার লোকদের দিচ্ছে। উই আর ইকুয়ালি ইলেক্টেড রিপ্রেজেন্টেটিভ অব দ্য পিপল।’
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলে তাহের বলেন, তাঁদের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বর্তমান সরকারই এখন বৈষম্যের চর্চা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের পুরো আন্দোলন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন আর এই বৈষম্যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাচ্ছে বিএনপি।’
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রশ্ন
দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও জনজীবনের সংকট নিয়েও কথা বলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। তাঁর অভিযোগ, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেল, সার ও বীজের সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছে।
তাহের বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশে গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, তেল নেই, সার নেই, বীজ নেই’—এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কতটা বাড়তে পারে, তারও কোনো সীমা দেখা যাচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর দাবি, দেশের সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ভুক্তভোগী হচ্ছে।
জরুরি অধিবেশন না ডাকায় ক্ষোভ
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে জরুরি সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ জানানো হয়েছিল বলে জানান তাহের। তবে সেই অনুরোধ অনুযায়ী সরকার কোনো অধিবেশন ডাকেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে হঠাৎ করে ২৭ আগস্ট সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। বিরোধী দল আশা করেছিল, তাদের দেওয়া চিঠি ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে। কিন্তু সেটি অধিবেশনের এজেন্ডায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাহের বলেন, ‘বিরোধী দল ভেবেছিল, চিঠির বিষয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেটা এজেন্ডা ছিল না।’
সংরক্ষিত নারী আসনেও বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগ
বিরোধী দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদেরও বাজেট ও উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের এই নেতা।
তাঁর দাবি, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদেরও জনগণের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রয়েছে। তাই তাঁদের জন্যও সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচিতে ন্যায্য বরাদ্দ থাকা উচিত।
গণভোটের রায় নিয়ে বিএনপির সমালোচনা
গণভোটের বৈধতা ও এর রায় বাস্তবায়ন নিয়েও বক্তব্য দেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তাঁর দাবি, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই ধরনের আদেশের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই গণভোটকে সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করলে একই যুক্তিতে নির্বাচন ও নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তিনি বলেন, ‘গণভোট সংবিধান কাভার করে না। যদি গণভোট সংবিধান কাভার না করে তাহলে নির্বাচনও কাভার করে না। বিএনপির টু–থার্ড মেজরিটির সরকারও কাভার করে না।’
তাহেরের বক্তব্য, গণভোট অবৈধ হলে সেই গণভোটের ভিত্তিতে গঠিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতাকেও বৈধ বলা যাবে না।
বিরোধী দল সংসদের ভেতরে ও বাইরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ লক্ষ্যেই বিরোধী দলের লংমার্চ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাহেরের অভিযোগ, লংমার্চের মাধ্যমে জনগণের কাছে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতে চায় বিরোধী দল। তাঁর ভাষায়, বিএনপি জাতির সঙ্গে ‘বেইমানি’ ও ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করছে এবং একই আইনের দুই ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছে—এ কথাই মানুষকে জানানো লংমার্চের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও বাস্তবে দুর্নীতি আরও বেড়েছে বলে দাবি করেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। এখন আমরা দেখছি জিরোটা আছে; কিন্তু তার বাঁয়ে আরও ১০০ যোগ হয়ে গেছে। তাইলে কত হয়? ১০০০ হয়। সেই হারেই দুর্নীতি চলছে।’
চাঁদাবাজির প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি কমার বদলে বাড়ছে।
তাহের বলেন, ‘চাঁদাবাজি কোনোভাবেই প্রধানমন্ত্রীর জানার বাইরে হতে পারে না। যেখানে জিরো টলারেন্স, সেখানে দুর্নীতি আরও লাফায় লাফায় বাড়তেছে।’
‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাস’
সংসদে সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বিল পাস করছে বলেও অভিযোগ করেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তাঁর দাবি, জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা, শুনানি ও বিরোধী দলের মতামত গ্রহণের সুযোগ না দিয়েই বিল পাস করা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রক্রিয়ার অংশ হতে বিরোধী দল রাজি নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সেটার দায়িত্ব নিতে চাই না। জনগণের সঙ্গে যে বিট্রায়াল, এটার আমরা শরিক হইতে চাই না।’
তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বার্থে বিরোধী দল আগেও প্রতিবাদ করেছে এবং এখনো একই অবস্থানে রয়েছে। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট বিলগুলোর আলোচনা, শুনানি বা অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে তাঁরা ওয়াকআউট করেছেন বলে জানান তিনি।
তিনটি বিল নিয়ে নাহিদ ইসলামের অভিযোগ
সংসদ থেকে ওয়াকআউটের পর আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে একই বিষয়ে কথা বলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তিনি কটূক্তি করেছেন। একই সঙ্গে স্পিকার বিরোধী দলের প্রতি পক্ষপাত ও বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ।
তাঁর দাবি, সংসদে এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে বিরোধী দলকেই অসহিষ্ণু হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলসহ তিনটি বিল সংসদে উত্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেতা এসব বিল আলাদাভাবে না এনে একসঙ্গে আনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সরকার তা না করে পৃথকভাবে বিলগুলো এনেছে এবং নিজেদের মতো করে পাস করিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, সংসদে এ ধরনের আচরণে ‘সরকারের সংসদীয় স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরতন্ত্র’ প্রকাশ পাচ্ছে। স্পিকার ও সরকারি দল এককভাবে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মক্কা প্যাক্টকে ইতিবাচক বললেন তাহের
এদিকে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মক্কা প্যাক্ট নিয়েও মন্তব্য করেন আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘মক্কা যে চুক্তি করেছে অ্যাপারেন্টলি আমরা মনে করি এটা একটা পজিটিভ।’
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে শুরু করে উন্নয়ন বরাদ্দ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, গণভোটের রায় এবং বিল পাসের প্রক্রিয়া—বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও সংসদের কার্যক্রম ও স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।