যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সহিংসতাকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করতে রাজি নন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান ‘সংঘাত’ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও দিতে পারেননি তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সময় এসব মন্তব্য করেন ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতকে সীমিত পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা দেখা গেছে, অন্যদিকে দীর্ঘায়িত সহিংসতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
সপ্তম মাসে গড়ানো এই সংঘাতের মধ্যে চলতি সপ্তাহে আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনাও বন্ধ রয়েছে।
‘আমি এটাকে যুদ্ধ বলব না’
সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ভ্যান্স বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান শেষ করেছে। তবে চলতি সপ্তাহে আবারও কিছু এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
ভ্যান্স বলেন, ‘আমি এটাকে “যুদ্ধ” বলব না। এখন কোনো গোলাগুলি চলছে না। আমি স্বীকার করছি, কিছু জায়গায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে।’
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রধান লক্ষ্য হলো ইরান যাতে বাণিজ্যিক তেল পরিবহনে আর বাধা দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখাকে ওয়াশিংটন অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের তেল পরিবহন হয়। সংঘাত শুরুর পর থেকে সেখানে ইরান নৌ চলাচলে বাধা দিচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এসব পদক্ষেপ বড় ধরনের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এড়াতে সহায়তা করেছে।
সংঘাত কবে শেষ হবে, জানেন না ভ্যান্স
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের শেষ কবে—এমন প্রশ্নের মুখে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেননি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ভ্যান্স বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ হলেই সংঘাতের অবসান ঘটবে। তবে তেহরান কবে জাহাজে হামলা বন্ধ করবে, সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো উত্তর নেই।
তিনি বলেন, ‘ইরানিরা কবে জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করবে? বাস্তবতা হলো, এর উত্তর আমি জানি না।’
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলে ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না বলেও স্পষ্ট করেন ভ্যান্স।
এর ফলে সংঘাতের সামরিক পর্ব শেষ হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি পার্থক্যও স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ানো হয়েছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এ অঞ্চলে সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার করেছে। বর্তমানে প্রায় ২০টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও সেখানে রয়েছে।
এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাশার তুলনায় বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রাখা হয়েছে। ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকেও সেনা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নেওয়া হয়েছে।
এই সামরিক উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়, ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে ওয়াশিংটন পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলে ধরে নিচ্ছে না। তবে রাজনৈতিকভাবে এটিকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত না করার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তেলের বাজারে চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বারবার সংঘর্ষ এবং সংঘাতের চূড়ান্ত সমাপ্তি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবারও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার জবাব হিসেবে দেশটির উপকূলীয় এলাকায় সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এসব হামলা চালানো হয়।
এর পর সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
রাজনৈতিক চাপেও ট্রাম্প প্রশাসন
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক বা জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর রাজনৈতিক প্রভাবও পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে।
এই সংঘাতের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই আগামী নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে।
ফলে ইরানের সঙ্গে সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য শুধু পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির বিষয় নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভ্যান্সের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে তাই একদিকে সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত না করার রাজনৈতিক সতর্কতা এবং অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ও তেল পরিবহন নিরাপদ রাখার সামরিক অগ্রাধিকার—দুটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়েছে।
তবে সংঘাতের প্রকৃত সমাপ্তির সময় সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজেই। বরং বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না—তাঁর বক্তব্যে এমনটাই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।