যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের সরকারি স্কুলগুলোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এক বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত করা এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শেখার সক্ষমতা ধরে রাখার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি গত বুধবার এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। প্রস্তাবিত এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবে শহরের সরকারি স্কুলগুলোর প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা নিউইয়র্ক শহরের সরকারি স্কুলে পড়ুয়া মোট শিক্ষার্থীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
মেয়র মামদানির মতে, প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পর্ককে দুর্বল না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে চান তিনি।
মামদানি বলেন, ‘প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে প্রাথমিক শিক্ষায় এআই ব্যবহার প্রয়োজনীয়। আমরা বিষয়টি এভাবে দেখি না।’
এক বছর পর প্রভাব মূল্যায়ন
প্রস্তাবিত নীতির আওতায় শুধু এআই ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞাই নয়, এর কার্যকারিতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে একটি জোট গঠন করা হবে।
এই জোট এক বছর এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা পর্যালোচনা করবে। শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতি, চিন্তাশক্তি ও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ওপর এর কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।
একই সঙ্গে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষগুলোতে স্কুলগুলোতে এআই ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা উচিত, সে বিষয়ে সুপারিশ করবে জোটটি। অর্থাৎ, এক বছরের নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী নীতি হিসেবে দেখার বদলে এর ফলাফল পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নিউইয়র্কের আগের পদক্ষেপ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নিউইয়র্ক এর আগেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছর নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভ্রান্তি কমানো ছিল ওই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এরও আগে, ২০২৩ সালে নিউইয়র্ক শহরের শিক্ষা বিভাগ স্কুলের কম্পিউটারগুলোতে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তখন শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্ট বা লেখাপড়ার কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ পেতে পারে—এমন উদ্বেগ থেকেই মূলত সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।
তবে সেই নিষেধাজ্ঞা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যেই নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষ চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
এবারের উদ্যোগ তাই শুধু কোনো একটি এআই টুল বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এক বছরের একটি বিস্তৃত নীতিগত বিরতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতে স্কুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে নতুন নীতি নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এআই দ্রুত শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও এর ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক চলছে। একদিকে প্রযুক্তিটি শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে পারে, অন্যদিকে অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নিউইয়র্কের নতুন উদ্যোগ সেই বিতর্কের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মৌলিক শেখার সক্ষমতা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে।