ঢাকা

হরমুজে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি দক্ষিণ কোরিয়ার, জানাল সংবাদমাধ্যম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহায়তার জন্য সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসব সরঞ্জাম মোতায়েন করা হতে পারে বলে দেশটির সরকারি ও সামরিক সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সহায়তার পরিসর ও ধরন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

তবে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট কার্যালয়। ফলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য মোতায়েনের যে তথ্য উঠে এসেছে, তা এখনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর কথা ভাবছে সিউল

সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে সহায়তার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের বিবেচনায় থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি সামুদ্রিক টহল বিমান, একটি রসদ সরবরাহকারী জাহাজ অথবা মাইন শনাক্ত ও অপসারণকারী একটি ইউনিট।

হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে এসব সক্ষমতা কাজে লাগানো হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঠিক কোন ধরনের সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, কতসংখ্যক সদস্য বা সামরিক সম্পদ সেখানে পাঠানো হবে এবং কত দিন সেগুলো মোতায়েন থাকবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সম্ভাব্য সহায়তার ধরন ও পরিসর নিয়ে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনসভার অনুমোদনের প্রস্তুতি

হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সে অনুযায়ী, সরকার এ বিষয়ে অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো। মন্ত্রিসভার পর্যালোচনা শেষে চলতি মাসেই আইনসভায় সম্মতি প্রস্তাব জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, সম্ভাব্য মোতায়েনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে দক্ষিণ কোরিয়াকে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর অস্বীকার ব্লু হাউসের

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ব্লু হাউস সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

ব্লু হাউস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে সিউল আলোচনা করছে। কিন্তু সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন খবর ‘তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’।

এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সহায়তা দিতে আগ্রহী কি না, তা নিয়ে আলোচনা চললেও নির্দিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এখনো অনুমোদিত হয়নি বলে স্পষ্ট হচ্ছে।

সরকারের এই অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, সিউল সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিভিন্ন দিক যাচাই করছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব আলোচনার ফল কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়।

হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহনের জন্য এই জলপথের ওপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।

চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের কারণে অঞ্চলটির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা সেই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টারই অংশ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষাপট

দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ।

গত আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে দক্ষিণ কোরিয়া রাজি না হওয়ায় দেশটির সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার আকার তিনি আংশিকভাবে কমিয়ে দিয়েছেন।

ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের পর দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সিউলের অবস্থান নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্ব পায়।

এখন হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিরাপদ রাখতে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়টি সামনে আসায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে সিউলের সামরিক ও কৌশলগত সমন্বয় নিয়েও নতুন করে নজর পড়েছে।

সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া নয়, নৌ চলাচলে সহায়তার সম্ভাবনা

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপকে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সহায়তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য মোতায়েনের উদ্দেশ্য সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া নাকি মূলত নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিবেচনায় থাকা সামুদ্রিক টহল বিমান, রসদ সরবরাহকারী জাহাজ কিংবা মাইন শনাক্ত ও অপসারণকারী ইউনিটের ধরন দেখে ধারণা করা যায়, সম্ভাব্য সহায়তার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে নৌপথের নিরাপত্তা ও চলাচল সচল রাখা।

তবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় এর প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের সুযোগ নেই।

বছরের শেষ নাগাদ মোতায়েনের সম্ভাবনা

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হতে পারে।

এর আগে মন্ত্রিসভার পর্যালোচনা, আইনসভার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মতো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

ফলে আপাতত সিউলের অবস্থানকে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার প্রস্তুতি ও আলোচনা পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতায় সহায়তার উপায় নিয়ে আলোচনা চললেও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় দক্ষিণ কোরিয়া শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ভূমিকা নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার ধরন, আইনসভার অনুমোদন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোই সিউলের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স