ঢাকা

ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইউক্রেনের সঙ্গে সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার এক অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কয়েকটি দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে শেষ পর্যন্ত সংঘাতের সমাধান করতে হবে যুদ্ধরত দুই দেশকেই।

একই দিনে ইউক্রেনও শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন গতি আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের সক্রিয়তা ফিরে আসায় শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন গতি আসতে পারে।

পুতিন বলেন, ‘যাঁরা এ মীমাংসায় অবদান রাখার চেষ্টা করছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। এখানে কি কোনো সম্ভাবনা রয়েছে? আমার দৃষ্টিতে, হ্যাঁ, সুযোগ রয়েছে।’

তবে রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও আলোচনার অগ্রগতির কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা তিনি দেননি। বরং ইউক্রেনের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ শান্তি আলোচনার পথে বাধা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

কিয়েভও দেখছে কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন গতি

পুতিনের বক্তব্যের পাশাপাশি ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার মন্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিয়েভে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাজধানীতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের যে সক্রিয় পর্যায় ফিরে এসেছে, এর মধ্য দিয়ে শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন গতি আসতে পারে।

সিবিহা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাজধানীতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের এই সক্রিয় পর্যায়টি ফিরে আসার মাধ্যমে শান্তি প্রচেষ্টায় আমরা এখন এক নতুন গতি পাব।’

তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বলে সাংবাদিকদের ‘সংবাদের দিকে নজর রাখতে’ বলেন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এই যুদ্ধ সাড়ে চার বছর ধরে চললেও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষের কাছ থেকেই শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া বিরল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আলোচনার পরও সংঘাত কমেনি

সর্বশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়ার পর রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে দূরপাল্লার বিমান হামলা আরও বাড়িয়েছে।

স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও সংঘাতের তীব্রতা বেড়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ ও সমুদ্রবন্দরে হামলার ঘটনায় কৃষ্ণসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও। বিশেষ করে শস্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে পুতিন ও সিবিহার সাম্প্রতিক বক্তব্য শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করলেও, বাস্তবে অগ্রগতির সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

ইউক্রেনের পদক্ষেপ নিয়ে রাশিয়ার অভিযোগ

শান্তি আলোচনার সম্ভাবনার কথা বললেও ইউক্রেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন পুতিন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলা এবং বেসামরিক বিমানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের শামিল এবং এগুলো দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

তবে ইউক্রেন এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিমান সংস্থা ও বিমা কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে বলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোনের তৎপরতার কারণে রাশিয়ার আকাশসীমা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইউক্রেনের সামরিক অভিযান কেবল রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হবে এবং কোনো বেসামরিক বিমানকে হুমকির মুখে ফেলার উদ্দেশ্য তাদের নেই।

রাশিয়ার আকাশসীমা নিয়ে কিয়েভের আহ্বান

বিমান চলাচল নিয়েও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত বুধবার ইউক্রেন আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা—আইসিএওর কাছে রাশিয়া সফর এবং রাশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সদস্যদেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।

২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনের আকাশসীমাকে অনিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

একদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার আকাশসীমার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আশঙ্কাকে শান্তি আলোচনার পথে বাধা হিসেবে তুলে ধরছে। এতে দুই পক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগও শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

যোগাযোগ এখনো অব্যাহত: পুতিন

ইউক্রেনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি বলেও জানিয়েছেন পুতিন। তাঁর দাবি, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে। তবে এই যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির দিকে নিয়ে যাবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

পুতিন বলেন, ‘ইউক্রেনের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে ইদানীং আমরা যেসব বক্তব্য শুনছি, তা বিবেচনা করলে এ ধরনের যোগাযোগ কতটুকু শান্তিচুক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা বলা আমার পক্ষে এখন কঠিন। তবে যোগাযোগ বজায় রয়েছে এবং নিয়মিতভাবে তা চলছে, যা প্রাথমিকভাবে মূলত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।’

অর্থাৎ রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রকাশ্য আলোচনা থমকে থাকলেও দুই দেশের মধ্যে কিছু যোগাযোগের চ্যানেল এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে পুতিনের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মধ্যস্থতায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত

শান্তি প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার বিষয়টিও পুতিনের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কয়েকটি দেশ শান্তি মীমাংসায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

তবে পুতিনের মতে, বাইরের দেশগুলো যতই সহযোগিতা করুক, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সমাধান করতে হবে রাশিয়া ও ইউক্রেনকেই।

এদিকে ভারতও শান্তি প্রচেষ্টায় সহযোগিতার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। কিয়েভে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহার পাশে উপস্থিত হয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারত যেকোনোভাবে সহায়তা করতে পারলে পাশে থাকবে।

জয়শঙ্কর বলেন, ‘ভারত যদি যেকোনোভাবে বা কোনো প্রকারে সাহায্য করতে পারে, তবে আমরা পাশে আছি।’

এর আগে সোমবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, মানবতার স্বার্থে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধে নেওয়া সব ধরনের পদক্ষেপে নয়াদিল্লি সমর্থন জানাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শান্তির সম্ভাবনা আছে, তবে পথ এখনো কঠিন

পুতিনের ‘সুযোগ রয়েছে’ মন্তব্য এবং কিয়েভের ‘নতুন গতি’র প্রত্যাশা—দুই পক্ষের সাম্প্রতিক বক্তব্যই দীর্ঘদিনের যুদ্ধের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই নতুন করে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ, শর্ত বা কাঠামো প্রকাশ করেনি।

বরং বেসামরিক জাহাজ, ড্রোন হামলা, আকাশসীমার নিরাপত্তা এবং সামরিক স্থাপনায় হামলা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আশাবাদ তৈরি হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা এখনো শান্তিচুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

তারপরও রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের সাম্প্রতিক বক্তব্যে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক সুরের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা, দুই দেশের যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলকে কতটা কার্যকর করে তুলতে পারে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স