গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে বিদেশে পাঠানোর একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সাত বছরের মধ্যে গাজার প্রায় সব বাসিন্দাকে উপত্যকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে বৃহস্পতিবার এই পরিকল্পনার কথা জানান বেন-গভির। দেশটির রাজনীতিতে যখন নির্বাচনী প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তখন তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
বেন-গভিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরেই গাজা থেকে প্রায় আড়াই লাখ ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর পরবর্তী ছয় বছরে উপত্যকায় থাকা আরও প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘বাস্তবসম্মত’ পরিকল্পনার দাবি
বেন-গভির তাঁর প্রস্তাবকে ‘বাস্তবসম্মত’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, গাজার বাসিন্দাদের গ্রহণ করতে কিছু দেশ প্রস্তুত রয়েছে। তবে কোন কোন দেশ এই পরিকল্পনায় রাজি বা ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে আগ্রহী, সে বিষয়ে তিনি কোনো দেশের নাম প্রকাশ করেননি।
তাঁর বক্তব্যে পরিকল্পনাটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, বাসিন্দাদের কীভাবে গাজা থেকে বের করে নেওয়া হবে কিংবা তাঁদের কোথায় পাঠানো হবে—এসব বিষয়েও বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
তবে গাজার জনসংখ্যা ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রশ্নে বড় ধরনের রাজনৈতিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা রয়েছে।
জোরপূর্বক স্থানান্তর নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের বিধান
দখলকৃত কোনো ভূখণ্ড থেকে বেসামরিক জনগণকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, দখলদার শক্তির মাধ্যমে কোনো অধিকৃত ভূখণ্ডের বেসামরিক নাগরিকদের জোরপূর্বক স্থানান্তর নিষিদ্ধ।
ফলে গাজা থেকে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে অন্য দেশে পাঠানোর যেকোনো পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে তাদের বসতভিটা থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
যুদ্ধবিরতি ও গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন বাস্তবতা
গাজা নিয়ে বেন-গভিরের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুদ্ধবিরতি ও উপত্যকার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার অধীনে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ওই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত ছিল গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান নির্দিষ্ট একটি সীমারেখা পর্যন্ত পেছনে সরিয়ে নেওয়া।
এই সীমারেখাটি ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত। চুক্তি অনুযায়ী, সীমারেখাটি কার্যকর হলে গাজা উপত্যকার প্রায় ৪৭ শতাংশ এলাকা ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে এবং ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল।
কিন্তু চুক্তির নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পেছনে সরে যাওয়ার পরিবর্তে গাজায় তাদের সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণের আওতা আরও বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজা উপত্যকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা—প্রায় ৬৬ শতাংশ—ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে গাজার বাসিন্দাদের চলাচল, বসবাস এবং মানবিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গাজার অবশিষ্ট বাসিন্দাদেরও কয়েক বছরের মধ্যে উপত্যকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনলেন বেন-গভির।
নির্বাচনের আগে বিতর্ক আরও তীব্র
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগে বেন-গভিরের এই বক্তব্য দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ককেও আরও উত্তপ্ত করতে পারে। তিনি ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ এবং গাজা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
গাজার ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনিদের সেখানে থাকার অধিকার এবং উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ—এসব প্রশ্ন ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেন-গভিরের প্রস্তাব সেই বিতর্কে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ধারণাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে তাঁর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি। কোন দেশ ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করবে, তাঁদের স্থানান্তর কীভাবে হবে কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুমোদন বা প্রতিক্রিয়া কী হবে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বেন-গভিরের সাত বছরের পরিকল্পনার বক্তব্য গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে সংঘাত শেষ করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী গাজার জনসংখ্যার বড় অংশকে উপত্যকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলছেন।
গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুতির মধ্যে এমন পরিকল্পনা সামনে আসায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ বসবাস এবং গাজার রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু নিয়েই বিতর্ক আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, বেন-গভিরের ঘোষিত পরিকল্পনা কি ইসরায়েল সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত হবে, নাকি এটি নির্বাচনী রাজনীতির অংশ হিসেবে দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই থাকবে। পাশাপাশি গাজার বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কী অবস্থান নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।