শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতা মূল্যায়নে আবারও এগিয়ে রয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। আন্তর্জাতিক শিক্ষামূল্যায়ন কর্মসূচি পিসা (পিআইএসএ)–এর সর্বশেষ মূল্যায়নে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে সিঙ্গাপুর। এরপর রয়েছে চীন, জাপান ও তাইওয়ান। শীর্ষ ১০–এর তালিকাতেও এশিয়ার দেশগুলোর শক্ত অবস্থান দেখা গেছে।
বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের একই ধরনের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করার কারণে পিআইএসএকে আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সর্বশেষ মূল্যায়নের ফলাফলে একদিকে যেমন এশিয়ার কয়েকটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য উঠে এসেছে, অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতায় দীর্ঘমেয়াদি অবনতির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
পিআইএসএ কী
পিআইএসএ হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষামূল্যায়ন কর্মসূচি। এতে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অর্জিত জ্ঞান কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তা যাচাই করা হয়। প্রতি তিন বছর পরপর বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশ ও অর্থনীতির শিক্ষার্থীরা এ মূল্যায়নে অংশ নেয়।
পিআইএসএতে প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাই করা হয়—গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতা। তবে এই মূল্যায়ন শুধু শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু কতটা মুখস্থ করেছে, তা যাচাই করে না। বরং শেখা জ্ঞান বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ, সমস্যা সমাধান এবং তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে কোনো সূত্র বা তথ্য শিখেছে কি না, তার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান ব্যবহার করে কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারছে কি না—পিআইএসএর মূল্যায়নে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘমেয়াদি অবনতির চিত্র
ওইসিডি প্রতিবছর নতুন নতুন শিক্ষাব্যবস্থাকে এ মূল্যায়নের আওতায় আনলেও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিশ্লেষণে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ মূল্যায়নের তথ্যেও গণিত, পড়ার দক্ষতা ও বিজ্ঞানে অনেক শিক্ষাব্যবস্থার স্কোর কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিশেষ করে মহামারির পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্কুল বন্ধ থাকা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ব্যাহত হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটার প্রভাব বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শুধু মহামারিকে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের অবনতির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যা, শেখার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ এবং পরিবর্তিত সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতাও এ প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
ওইসিডির পিআইএসএ প্রকল্প মূলত তরুণদের বাধ্যতামূলক স্কুলজীবন শেষ করার কাছাকাছি সময়ে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগক্ষমতা পরিমাপ করে। ফলে এ মূল্যায়নের ফল কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা বোঝার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রস্তুতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
শীর্ষে সিঙ্গাপুর
সর্বশেষ মূল্যায়নে গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতার সম্মিলিত ফলাফলের হিসাবে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির স্কোর ১ হাজার ৬৭৯। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন, যার স্কোর ১ হাজার ৬০৫।
জাপান ও তাইওয়ান উভয়েই ১ হাজার ৫৯৯ স্কোর নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে। এ ফলাফলের মধ্য দিয়ে এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর ধারাবাহিক সাফল্যের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
পিআইএসএর মূল্যায়নে দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ার কয়েকটি দেশ ও অর্থনীতি গণিত, বিজ্ঞান এবং পড়ার দক্ষতায় শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক শিক্ষামূল্যায়নে শক্তিশালী ফল করে আসছে।
শীর্ষ ১০–এ এশিয়ার পাঁচ দেশ
সর্বশেষ মূল্যায়নের শীর্ষ ১০ শিক্ষাব্যবস্থার তালিকায় এশিয়ার পাঁচটি দেশ বা অর্থনীতি রয়েছে। এগুলো হলো সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
শীর্ষ ১০–এর তালিকায় সিঙ্গাপুরের পর রয়েছে চীন, জাপান ও তাইওয়ান। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান। দেশটির স্কোর ১ হাজার ৫৭০।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে হংকং, যার স্কোর ১ হাজার ৫৬০। হংকংকে আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে পিআইএসএতে মূল্যায়ন করা হয়।
শীর্ষ ১০–এর বাকি শিক্ষাব্যবস্থাগুলো হলো এস্তোনিয়া, কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড। তাদের স্কোর যথাক্রমে ১ হাজার ৫৪৭, ১ হাজার ৫১৯, ১ হাজার ৫১২ ও ১ হাজার ৪৯৪।
অর্থাৎ শীর্ষ ১০–এর তালিকায় এশিয়ার দেশ ও অর্থনীতির আধিপত্য বেশ স্পষ্ট। সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়া এবং হংকং পর্যন্ত এশিয়ার একাধিক শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফলাফলেও অবনমন
সর্বশেষ বৈশ্বিক মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতার ফলাফল প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২২ সালের তুলনায় দেশটির শিক্ষার্থীদের স্কোর ১৪ পয়েন্ট কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট স্কোর ১ হাজার ৪৬৮, যা শীর্ষ ১০–এর শেষ দেশ সুইজারল্যান্ডের চেয়ে ২৬ পয়েন্ট কম। ফলে বিশ্বের অন্যতম উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের ফলাফলও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি গণিত ও বিজ্ঞানের ফলাফল নিয়েও বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ রয়েছে। পিআইএসএর ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ হওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষার্থীদের উচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করে না। শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো, শিক্ষার মান, শিক্ষকতার পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ
পিআইএসএর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি শুধু প্রচলিত পরীক্ষার মতো পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান যাচাই করে না। শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিতে গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতা কতটা ব্যবহার করতে পারে, সেটিই এ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফলে কোনো দেশের পিআইএসএ ফলাফলকে শুধু পরীক্ষার নম্বর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কতটা অর্জন করছে, তারও একটি ধারণা পাওয়া যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতার অবনতি দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ফলাফলে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক পরীক্ষার প্রস্তুতির পরিবর্তে শিক্ষার মৌলিক কাঠামো ও শেখার পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
পিআইএসএর সর্বশেষ ফলাফল তাই একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে। একদিকে সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার কয়েকটি শিক্ষাব্যবস্থা গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতায় বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে; অন্যদিকে বহু দেশে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতায় দীর্ঘমেয়াদি অবনতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই দুই চিত্রই বিশ্বজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও বিস্তারিত তথ্য দেখতে World Population Review ওয়েবসাইটে দেখা যেতে পারে।