জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, এ ধরনের আচরণ কোনো সংসদীয় রীতিনীতি বা গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হতে পারে না।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে গত বুধবারের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে এ অভিযোগ করেন তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, আগের দিন ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) বিলের ওপর বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে হইচই শুরু হয় এবং কেউ কেউ অশোভন ভাষা ব্যবহার করেন। ওই ঘটনার পর সংসদে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিলের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে গতকাল আমি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তাতে এই সংসদে কোনো ডিসেন্ট ভয়েস রেইজ করা যায় বলে আমার মনে হয়নি।’
রুমিনের ভাষ্য, তাঁর বক্তব্যের কোনো বিষয়ে আপত্তি থাকলে বক্তব্য শেষ হওয়ার পর দাঁড়িয়ে তার জবাব দেওয়া যেত। কিন্তু বক্তব্য চলাকালে এবং পরে সংসদে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সংসদে প্রত্যাশিত নয়।
তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, এই মহান সংসদে আমারই আশপাশের সংসদ সদস্যরা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছেন। এটা কোনো সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না।’
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সময় সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে হইচই দেখা যায়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ হাত দিয়ে থামার ইঙ্গিত দেন।
ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সবার: স্পিকার
রুমিন ফারহানার অভিযোগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদে বাক্স্বাধীনতার পক্ষে তিনি। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দলের কোনো সদস্য বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া উচিত নয়।
গত বুধবারের ঘটনা ঘটে গেছে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে। একই সঙ্গে রুমিন ফারহানার অনুভূতির প্রতিও সম্মান জানান তিনি।
জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, সংসদে সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র নির্বাচিত সংসদ সদস্য—সব পক্ষেরই ভিন্নমত থাকতে পারে। প্রত্যেকের সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত।
আগের সংসদের প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ
নিজের বক্তব্যে ২০১৮ সালের সংসদের প্রসঙ্গও টেনে আনেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ওই সংসদে বিএনপির পক্ষে একা দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়ও তাঁকে একই ধরনের জঘন্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
রুমিন বলেন, কয়েক হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পরও যদি ন্যূনতম পরিবর্তন না আসে, তাহলে এই সংসদে বিরোধী দল সেজে শুধু ভোট দেওয়ার জন্য থাকার কোনো প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
র্যাব বিলুপ্তির প্রসঙ্গ
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিলের আলোচনার মধ্যে র্যাব বিলুপ্তির বিষয়টিও তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তাঁর দাবি, র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে এই বাহিনী নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
র্যাবের পরিবর্তে নতুন যে সংস্থা গঠন করা হচ্ছে, সেটি যেন কেবল নাম ও পোশাক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক করেন রুমিন।
তিনি বলেন, নতুন সংস্থার তদন্তব্যবস্থা, আটক করার প্রক্রিয়া এবং আটকাদেশের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এ সময় স্পিকার তাঁকে থামিয়ে বলেন, ‘এখন আমরা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন নিয়ে আলোচনা করতেছি। এসআরবি পাস হয়ে গেছে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান
বিগত দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, বিভিন্ন সময়ে মানুষকে হেনস্তা, নির্যাতন ও ভয়ভীতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে তিনি এ ধরনের আচরণ দেখতে চান না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছে। সংসদে উপস্থিত সব রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে বলে তিনি আশা করেন।
পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী যাতে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
রুমিনের বক্তব্যের জবাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যের জবাব দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো সদস্যের অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক জবাব দিতে তিনি রাজি নন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের দিন যে বিলটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেটি অর্থমন্ত্রীর একটি বিল এবং এর সঙ্গে একটি বিলুপ্ত আইন-সম্পর্কিত বিষয় ছিল।
রুমিন ফারহানা যেসব বিষয় উত্থাপন করেছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগ ওই বিলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল না বলেই এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সংসদে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ, সদস্যদের পারস্পরিক আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এদিনের আলোচনায় সংসদীয় পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।