ঢাকা

নিজের পাতা ফাঁদেই কি আটকে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, চার উড়োজাহাজে ১৯ ছিনতাইকারী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ফিরে দেখা

এক সকালেই ধসে পড়েছিল নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই হামলায় যে পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল, তার অভিঘাত ২৫ বছর পরও শেষ হয়নি। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ আফগানিস্তান ও ইরাক পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ অস্থিরতার নতুন অধ্যায় তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে লিবিয়া, সিরিয়া থেকে শুরু করে ইরানকে ঘিরে সংঘাত—সবকিছুর পেছনে ৯/১১-পরবর্তী ভূরাজনীতির দীর্ঘ ছায়া খুঁজে পান অনেক বিশ্লেষক।

সময়টা তখন সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। এর কয়েক মুহূর্ত আগেও নিউইয়র্ক ছিল আর দশটা দিনের মতোই। অফিসগামী মানুষের ভিড়, স্কুলে যাওয়ার তাড়া, রাস্তায় যানজট—সবকিছু চলছিল স্বাভাবিক নিয়মে। কেউ জানতেন না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাবে।

আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সেই ভয়াবহ অধ্যায়। মাত্র ১৭ মিনিট পর দ্বিতীয় একটি বিমান আঘাত করে সাউথ টাওয়ারে। এরপর পেন্টাগনে হামলা এবং পেনসিলভানিয়ায় আরেকটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায়—যুক্তরাষ্ট্র নজিরবিহীন সমন্বিত সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে।

ঘটনাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভূগোল, রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থাই বদলে দেয়নি; বদলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মুসলিম ও আরব জনগোষ্ঠীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, অভিবাসননীতি এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন।

প্রতিবছর ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে নিহতদের নাম পাঠ করা হয়, নীরবতা পালন করা হয়। কিন্তু স্মরণানুষ্ঠানের পাশাপাশি আজও ফিরে আসে নানা প্রশ্ন—কীভাবে চারটি উড়োজাহাজ একসঙ্গে ছিনতাই হলো, কেন আগাম সতর্কবার্তা কাজে লাগানো গেল না এবং হামলার পর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বকে কোথায় নিয়ে গেল?

সেই সকাল: যখন সময় থমকে গিয়েছিল

মার্কিন পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে। প্রথম মুহূর্তে অনেকে এটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু ১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করলে আর কোনো সন্দেহ থাকে না—এটি ছিল পরিকল্পিত হামলা।

নর্থ টাওয়ার থেকে আগুন ও কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশে উঠতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমে আসে ধুলার আস্তরণ। ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষ সাহায্যের জন্য ফোন করেন। কেউ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন, কেউ জানালা দিয়ে সাহায্যের সংকেত দেন। ভবনের বাইরে তখন হাজারো মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছিলেন।

সেদিনের নিউইয়র্ক ছিল একই সঙ্গে ব্যস্ত ও আতঙ্কিত। শহরের প্রাইমারি নির্বাচনের দিন ছিল ১১ সেপ্টেম্বর। সকাল ছয়টায় ভোটকেন্দ্র খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।

ওয়াশিংটনে তখন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের মাত্র নয় মাস চলছে। নিউইয়র্কের মেয়র রুডি জুলিয়ানির মেয়াদও শেষের দিকে। শহরের জীবনযাত্রায় তখনও স্বাভাবিকতার ছাপ ছিল। কিন্তু সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বাভাবিকতা পরিণত হয় জাতীয় বিপর্যয়ে।

চার উড়োজাহাজ, ১৯ ছিনতাইকারী

সেদিন চারটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করা হয়। হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও রাজনৈতিক স্থাপনা।

ঘটনাপ্রবাহ ছিল এমন—

সকাল ৭টা ৫৯ মিনিট: বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭৬ যাত্রী, ১১ ক্রু ও পাঁচ ছিনতাইকারী নিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ উড্ডয়ন করে।
সকাল ৮টা ১৫ মিনিট: একই বিমানবন্দর থেকে ৫১ যাত্রী, নয় ক্রু ও পাঁচ ছিনতাইকারী নিয়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ উড্ডয়ন করে।
সকাল ৮টা ২০ মিনিট: ওয়াশিংটনের ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫৩ যাত্রী, ছয় ক্রু ও পাঁচ ছিনতাইকারী নিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ উড্ডয়ন করে।
সকাল ৮টা ৪২ মিনিট: নিউ জার্সির নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩৩ যাত্রী, সাত ক্রু ও চার ছিনতাইকারী নিয়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩ উড্ডয়ন করে।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট: ফ্লাইট ১১ নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে।
সকাল ৯টা ৩ মিনিট: ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত হানে।
সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট: ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আঘাত হানে।
সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট: সাউথ টাওয়ার ধসে পড়ে।
সকাল ১০টা ৩ মিনিট: ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে বিধ্বস্ত হয়।
সকাল ১০টা ২৮ মিনিট: নর্থ টাওয়ার ধসে পড়ে।

ফ্লাইট ৯৩-এর সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবন অথবা হোয়াইট হাউস—এমন ধারণা তদন্তে উঠে আসে। তবে উড়োজাহাজটির যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর ফলে বিমানটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি এবং পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারের পাশাপাশি কমপ্লেক্সের আরও কয়েকটি ভবনও ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলে মাসের পর মাস। ২০০২ সালের ৩০ মে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রাউন্ড জিরোর শেষ বড় স্টিলের অংশ সরানোর মধ্য দিয়ে উদ্ধার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

প্রাণহানি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

৯/১১ হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন। নিউইয়র্কে প্রাণ হারান ২ হাজার ৭৫৩ জন, পেন্টাগনে ১৮৪ জন এবং পেনসিলভানিয়ায় ৪০ জন।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন অফিসকর্মী, পর্যটক, বিভিন্ন দেশের নাগরিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও দমকলকর্মী। আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে গিয়ে প্রাণ হারান নিউইয়র্ক ফায়ার সার্ভিসের ৩৪৩ জন সদস্য এবং ৬০ জনের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

হামলায় নিহত ১৯ ছিনতাইকারীকে এই মোট সংখ্যার মধ্যে ধরা হয় না।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার সময় কমপ্লেক্সে হাজার হাজার মানুষ ছিলেন। নর্থ টাওয়ারে আটকে পড়া কেউই জীবিত বের হতে পারেননি। অন্যদিকে সাউথ টাওয়ারের ওপরের তলায় থাকা ১৮ জন কোনোভাবে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

১৯৪১ সালের পার্ল হারবার হামলার পর ৯/১১-কে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে ৯/১১-এর ক্ষয়ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রাউন্ড জিরোতে উদ্ধার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেওয়া বহু ফার্স্ট রেসপন্ডার ও স্থানীয় বাসিন্দা পরবর্তী সময়ে শ্বাসতন্ত্রের নানা সমস্যা, ক্যানসারসহ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলা ও অন্যান্য দূষকের প্রভাব নিয়ে পরবর্তী বছরগুলোতে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে।

হামলার নেপথ্যে আল-কায়েদা

৯/১১ হামলার জন্য দায়ী করা হয় জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদাকে। সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন সৌদি বংশোদ্ভূত ওসামা বিন লাদেন।

আল-কায়েদার বিকাশ ঘটে ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের সময়। পরে সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয়। ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা হামলাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সংগঠনটির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।

৯/১১ ছিল তাদের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সুপরিকল্পিত অভিযান।

হামলায় অংশ নেওয়া ১৯ জনের মধ্যে অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন। তাঁদের কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতি পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীদের নজরে আসে।

হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি এবং সম্ভাব্য হুমকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি পরবর্তী তদন্তে বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

নিরাপত্তাব্যবস্থার কোথায় ছিল ফাঁক?

৯/১১-এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থা আজকের মতো কঠোর ছিল না। ককপিটের দরজা, যাত্রী তল্লাশি এবং বিমানে ধারালো ছোট অস্ত্র বহনের বিষয়ে বিধিনিষেধও ছিল তুলনামূলক শিথিল।

হামলাকারীরা এই দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ফ্লাইট ৯৩-এর ঘটনা অবশ্য ভিন্ন ছিল। যাত্রীরা ফোনে স্বজনদের কাছ থেকে অন্য তিনটি বিমানের হামলার খবর পাওয়ার পর বুঝতে পারেন, তাঁদের বিমানও ছিনতাই হয়েছে। এরপর কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু ককপিটে ঢোকার চেষ্টা করেন। তাঁদের প্রতিরোধের ফলেই বিমানটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি বলে তদন্তে উঠে আসে।

৯/১১-পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়, বিমানবন্দর নিরাপত্তা, যাত্রী পরিচয় যাচাই এবং সন্ত্রাসী অর্থায়ন শনাক্তকরণে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়।

১৯৯৩ সালেও লক্ষ্য ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার

৯/১১ ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম হামলা নয়। এর আট বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভবনটির ভূগর্ভস্থ পার্কিং এলাকায় একটি ভ্যানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

সেই হামলায় ছয়জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। তদন্তে হামলাটির সঙ্গে ইসলামপন্থী চরমপন্থীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।

১৯৯৩ সালের হামলার পরও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল। কিন্তু আট বছর পরের হামলার ব্যাপকতা ও ধ্বংসযজ্ঞ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।

৯/১১-এর পর মুসলিমদের জীবনে অন্ধকার অধ্যায়

হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত মানুষের জীবনেও বড় পরিবর্তন আসে। বহু মুসলিম নাগরিক ও অভিবাসীকে সন্দেহ, হয়রানি, বৈষম্য ও ঘৃণার মুখোমুখি হতে হয়।

মসজিদে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যার হুমকি এবং মুসলিমদের ওপর শারীরিক আক্রমণের ঘটনাও বাড়তে থাকে।

মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় ২০০১ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ২০০০ সালে এ ধরনের ঘটনা ছিল কয়েক ডজন; ২০০১ সালে তা কয়েক শতে পৌঁছে যায়।

হামলার মাত্র ছয় দিন পর, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ওয়াশিংটনের ইসলামিক সেন্টারে গিয়ে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাস ইসলাম ধর্মের শিক্ষা নয় এবং সন্ত্রাসীরা মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

কিন্তু প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্যের পরও মাঠপর্যায়ে ইসলামভীতি ও বৈষম্য পুরোপুরি থামেনি।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক স্যালি হাওয়েলের মতে, ৯/১১-পরবর্তী ভয় ও নিরাপত্তা-উদ্বেগের পরিবেশ নাগরিকদের ওপর নজরদারি, হয়রানি এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে নানা ধরনের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করেছিল।

ইসলামভীতি যখন রাজনীতির হাতিয়ার

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে নির্বাচনী মৌসুমে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে বলে বিভিন্ন গবেষক ও অধিকারকর্মী মনে করেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ক্ষেত্রেও তাঁর জন্মস্থান ও ধর্ম নিয়ে ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো হয়েছিল। তাঁকে গোপনে মুসলিম হিসেবে তুলে ধরে তাঁর প্রতি অবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা করা হয়।

২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্পও মুসলিমদের নিয়ে কঠোর বক্তব্য দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকটি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্বাহী আদেশ জারি করে। বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং পরে সংশোধিত সংস্করণ মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বহাল থাকে।

সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ছিল, এসব ব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।

প্রতিকূলতার মধ্যেও মুসলিমদের রাজনৈতিক উত্থান

তবে ৯/১১-পরবর্তী বৈষম্যের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে।

২০০৭ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব প্রথম দুই মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসে নির্বাচিত হন।

মুসলিম আমেরিকানদের জনসংখ্যাও গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে দেশটিতে মসজিদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষকদের মতে, মুসলিমদের সামাজিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কে মানুষের সরাসরি অভিজ্ঞতাও বাড়ছে। সহকর্মী, প্রতিবেশী বা স্থানীয় ব্যবসায়ী হিসেবে মুসলিমদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠলে ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা কমে আসার প্রবণতা দেখা যায়।

‘ইসরায়েলি গোয়েন্দারা আগেই জানতেন’—দাবি ও বিতর্ক

৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে হামলা নিয়ে পুরোনো কিছু বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, হামলার আগে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্য বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হামলার বিষয়ে আগাম তথ্য জানতেন।

একটি প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ এবং পিয়ার্স মরগানের অনুষ্ঠান ‘আনসেন্সরড নিউজ’-এ কার্লসন এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি ‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্টস’ নামে পরিচিত একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ৯/১১-এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কিছু ইসরায়েলি নাগরিকের কর্মকাণ্ড নিয়ে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

কার্লসন অবশ্য স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি ইহুদিদের ৯/১১ হামলার জন্য দায়ী করছেন না। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—হামলার আগে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে কিছু জানত কি না, তা আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

তবে এসব দাবি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ৯/১১ হামলার সরকারি তদন্ত ও বহুল স্বীকৃত গবেষণায় আল-কায়েদাকেই হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে। ইসরায়েলি সরকার বা গোয়েন্দা সংস্থা হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ফলে এ ধরনের বক্তব্যকে প্রমাণিত তথ্যের বদলে বিতর্কিত দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’—আফগানিস্তান থেকে ইরাক

৯/১১-এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করে।

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। প্রায় দুই দশক পর ২০২১ সালে মার্কিন ও মিত্রবাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার শুরু করলে তালেবান আবারও দ্রুত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এরপর ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট। পরে ইরাকে এমন অস্ত্রের মজুতের দাবির পক্ষে প্রত্যাশিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইরাক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাড়ে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

লিবিয়া ও সিরিয়ার সংকট, ইসলামিক স্টেটের উত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার সঙ্গেও ৯/১১-পরবর্তী মার্কিন নীতির সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।

নজরদারি ও নিরাপত্তার নতুন যুগ

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। প্যাট্রিয়ট অ্যাক্টের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী তদন্ত ও নজরদারির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

বিমানবন্দরগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা চালু হয়। যাত্রীদের পরিচয় যাচাই, লাগেজ পরীক্ষা, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং সীমান্ত নজরদারির পরিধি বাড়ানো হয়।

একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপ নাগরিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়।

অর্থাৎ ৯/১১-এর পর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে যে প্রশ্নটি উঠেছিল, সেটি এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি।

অর্থনীতিতেও গভীর ক্ষত

হামলার ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও পড়ে। শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন হয়, বিমান ও পর্যটন খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়। বিমা খাতে ক্ষতির পরিমাণও ছিল বিপুল।

নিউইয়র্কের অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতেই বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে গঠন করা তহবিল থেকেও কয়েক বিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়।

হামলার পর নিউইয়র্কে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সাময়িক বা স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়। শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেও সময় লাগে।

ওসামা বিন লাদেনের পরিণতি

৯/১১-এর মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত ওসামা বিন লাদেন প্রায় এক দশক ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিলের বিশেষ অভিযানে তিনি নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি ছিল ৯/১১-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ সবচেয়ে প্রতীকী সাফল্যগুলোর একটি।

কিন্তু বিন লাদেনের মৃত্যু সন্ত্রাসবাদ বা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটায়নি। বরং পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদা ও অন্যান্য চরমপন্থী সংগঠন বিভিন্ন অঞ্চলে নতুনভাবে সক্রিয় হয়।

২৫ বছর পরও শেষ হয়নি ৯/১১-এর ছায়া

দুটি বিশাল টাওয়ার ধসে পড়তে সময় লেগেছিল কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু সেই ধসের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে একটি প্রজন্মজুড়ে।

৯/১১ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি কালো দিন নয়; এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে।

হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তৎপরতা বেড়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, বিপুল বেসামরিক প্রাণহানি এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—সন্ত্রাস মোকাবিলার নামে নেওয়া সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে আরও নিরাপদ করেছে, নাকি নতুন সংঘাতের বীজ বপন করেছে?

আফগানিস্তান থেকে ইরাক, লিবিয়া থেকে সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো সেই প্রশ্নকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তা ও যুদ্ধনীতির পথ বেছে নিয়েছিল, তার দীর্ঘমেয়াদি ফল এখনো বিশ্ব রাজনীতিতে দৃশ্যমান।

তাই ২৫ বছর পর ৯/১১ ফিরে দেখা মানে শুধু ধ্বংস হওয়া দুটি ভবন, চারটি ছিনতাই করা উড়োজাহাজ কিংবা ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত মানুষের স্মৃতি মনে করা নয়। এর অর্থ হলো—সেই হামলার পর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে একটি নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা তৈরি করল, সেটিও ফিরে দেখা।

আর সেখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি থেকে যায়—সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত এমন এক দীর্ঘ সংঘাতের চক্র তৈরি করেছিল, যার অভিঘাত এখনো তার নিজের নীতিকেই তাড়া করে ফিরছে?

তথ্যসূত্র: এবিসি নিউজ, সিবিএস, এফবিআই, পিউ রিসার্চ সেন্টার, মার্কিন সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিবেদন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স