ঢাকা

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৫০টির সভাপতি নির্বাচিত, বিরোধী দলের নেতৃত্ব একটিতে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। তবে এসব কমিটির মধ্যে মাত্র একটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন বিরোধী দলের একজন সদস্য। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন না হওয়ায় এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল।

বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনে চারটি স্থায়ী কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে ৫০টি কমিটির গঠনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এদিন প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, জনপ্রশাসন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটি গঠন শেষ হওয়ার পর কয়েকটি কমিটির সভাপতির পদে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ভবিষ্যতে কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর আগে মঙ্গলবারও সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও হুইপদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন।

শেষ দিনে চার কমিটি গঠন

অধিবেশনের শেষ দিনে গঠিত চারটি কমিটির মধ্যে প্রতিরক্ষা–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আশরাফ উদ্দিনকে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন সরকারদলীয় হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সাঈদ আহমেদকে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

এদিন চারটি কমিটি গঠনের পাশাপাশি আরও ছয়টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গঠন সম্পন্ন হলো। তবে কমিটিগুলোতে সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী হলে ১৪টি সভাপতির পদ পেত বিরোধী দল

জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন করা হলে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পেত। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত তারা মাত্র একটি কমিটির সভাপতির পদ পেয়েছে।

সনদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে গত ৩০ আগস্ট জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছিল। সে সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিলে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে।

তবে বিরোধী দল ওই বিশেষ কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি দেয়নি। এর পরও সংসদীয় কমিটিগুলোর সবকটিতেই বিরোধী দলের একাধিক সদস্য রাখা হয়েছে। তবে সভাপতির পদ পেয়েছে কেবল সরকারি হিসাব কমিটিতে।

বিরোধী দলের অসন্তোষ

কমিটি গঠন শেষ হওয়ার পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং হুইপ রফিকুল ইসলাম খানের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি। এমনকি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আগে দেওয়া সদস্য তালিকাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সদস্যের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। বিরোধী দল আগে যে তালিকা দিয়েছিল, সেই অনুযায়ী সব সদস্যকে কমিটিতে রাখা হয়নি।

তিনি বলেন, ১০ সদস্যের প্রতিটি সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দল প্রথমে তিনজন করে সদস্য চেয়েছিল। পরে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মোট সদস্যের ২৬ শতাংশ হারে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সে অনুযায়ী কোনো কমিটিতে তিনজন এবং কোনো কমিটিতে দুজন বিরোধী দলের সদস্য থাকার কথা ছিল।

তবে নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, কোন কমিটিতে তিনজন এবং কোন কমিটিতে দুজন বিরোধী দলের সদস্য থাকবেন, সে বিষয়েও তাদের দেওয়া তালিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, তাঁরা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর দেখতে চান। কিন্তু কমিটিগুলো যদি ইচ্ছামতো গঠন করা হয়, তাহলে বিরোধী দলের পক্ষে এসব কমিটিতে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিরোধী দলকে মোট সদস্যের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে তাদের সদস্যসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে।

সরকারি দলের ব্যাখ্যা

বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব হিসাব করেই সদস্য বণ্টন করা হয়েছে।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ১৯টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে এবং বাকি কমিটিগুলোতে দুজন করে সদস্য থাকার কথা। তবে বাস্তবে ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এরপরও কোথাও কোনো ত্রুটি বা অসামঞ্জস্য থেকে থাকলে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন চিফ হুইপ।

কমিটির সভাপতি নিয়ে স্পিকারের উষ্মা

সংসদীয় কমিটি গঠন শেষ হওয়ার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কমিটির সভাপতি নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে তাঁর অসন্তোষের কথা জানান।

তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ আইনসভার কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু নির্বাহী বিভাগের কেউ যদি সংসদীয় কমিটির সভাপতি হন, তাহলে সেই কমিটির কাছে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির বিষয়টি কীভাবে কার্যকর হবে—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।

স্পিকার বলেন, বিষয়টিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার আলোকে দেখা উচিত। ভবিষ্যতে সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের সময় এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও হুইপ কমিটির সভাপতি

ত্রয়োদশ সংসদের বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী একাধিক ব্যক্তি রয়েছেন। মন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, চিফ হুইপ এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার সরকারদলীয় হুইপদের কয়েকটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি।

হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন। হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি এবং হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন।

এ ছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়াকে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ জি কে গউছকে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

সাধারণত সংসদ সদস্য হওয়ার পর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। এর বাইরে অন্য কমিটিতে তাঁদের সদস্য করার নজির তুলনামূলকভাবে কম।

জুলাই সনদে বিরোধী দলের সভাপতির পদ নিয়ে কী বলা আছে

বর্তমান ব্যবস্থায় সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান–সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধীদলীয় সদস্যদের দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। এ বিধান সংবিধানে যুক্ত করার কথাও জুলাই সনদে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।

২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী ১৪টি কমিটির সভাপতি হওয়ার কথা

বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৩৯টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতির পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা।

এর সঙ্গে জুলাই সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটির সভাপতির পদ যোগ করলে বিরোধী দলের মোট ১৪টি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার কথা।

কিন্তু ৫০টি কমিটি গঠন সম্পন্ন হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে বিরোধী দলের হাতে এসেছে মাত্র একটি কমিটির সভাপতির পদ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জুলাই সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা অপরিহার্য নয়। কারণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দলের সদস্য হবেন, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই। ফলে সরকার চাইলে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে এখনই এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারে।

সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিরোধ

জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ।

ওই কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন প্রতিনিধি রাখার জন্য তাদের কাছে নাম চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল কোনো নাম দেয়নি।

বিরোধী দল ওই বিশেষ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। তবে সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ধারণাগত মতভিন্নতা রয়েছে।

ফলে একদিকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গঠন সম্পন্ন হলেও অন্যদিকে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ এখনো কাটেনি। বিরোধী দলের দাবি, সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে তাদের প্রাপ্য প্রতিনিধিত্ব এবং সভাপতির পদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সদস্য বণ্টনে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্বের নীতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং কোনো অসঙ্গতি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স