ঢাকা

জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে বিরোধ, মমতা ও ঋতব্রতকে দিল্লিতে ডেকেছে কমিশন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়ে দলটির দুই পক্ষের বিরোধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতীকের মালিকানা নিজেদের দাবি করে ভারতের নির্বাচন কমিশনে (ইসিআই) পাল্টাপাল্টি আবেদন জানিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশ এবং বিদ্রোহী বিধায়কদের অংশ। বিরোধ নিষ্পত্তিতে এবার দুই পক্ষকেই দিল্লিতে তলব করেছে নির্বাচন কমিশন।

আগামী শনিবার দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকশন ম্যানেজমেন্টের দপ্তরে পৃথক শুনানিতে দুই পক্ষের বক্তব্য শুনবে কমিশন। সেখানে উভয় পক্ষ নিজেদের দাবির পক্ষে যুক্তি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করবে। শুনানি শেষে প্রতীক নিয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত জানাবে।

বুধবার এ বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিদ্রোহী অংশের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। চিঠি অনুযায়ী, শনিবার বেলা ১১টায় প্রথমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুনানি হবে। এরপর দুপুর ১২টায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বসবে কমিশন। প্রতিটি পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজন প্রতিনিধি শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের ইতিহাস

১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাঁর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের বিস্তার ঘটে। দলটির নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ও মমতার ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন নির্বাচনে এই প্রতীকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে তৃণমূল।

তবে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর দলের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৮টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হন। বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস পায় মাত্র ৮০টি আসন।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দলটির অভ্যন্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তোলা হয়। একপর্যায়ে তৃণমূলের ৮০ বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৬৫ জন মমতার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে দল ছাড়েন।

বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে পাল্টা তৃণমূল

দলত্যাগী বিধায়কেরা পরে একত্র হয়ে গড়ে তোলেন পাল্টা তৃণমূল। এই অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে বিধানসভার স্পিকার বিদ্রোহী অংশটিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পান।

ফলে মূল তৃণমূলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকা বিধায়কের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর মধ্যেই দলের সাংগঠনিক পরিচয়, নেতৃত্ব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়।

উপনির্বাচন সামনে রেখে প্রতীকের লড়াই

প্রতীক নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আসন্ন উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। আগামী ৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের দুটি বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। আসন দুটি হলো পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের রেজিনগর। এসব আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৬ সেপ্টেম্বর।

উপনির্বাচনের আগে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি নির্বাচন কমিশনের সামনে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। কমিশনে দেওয়া আবেদনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশের দাবি, তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়ক ও নেতা এখন তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। ফলে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারের অধিকার তাঁদেরই।

বিদ্রোহী অংশের যুক্তি, দলীয় নেতৃত্ব ও বিধায়কদের বড় অংশ তাদের সঙ্গে থাকায় সাংগঠনিকভাবে তারাই তৃণমূলের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই কারণে নির্বাচনে দলের পুরোনো প্রতীক ব্যবহারের অধিকারও তাদের থাকা উচিত বলে দাবি করছে তারা।

মমতার অংশের যুক্তি, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতীকের স্রষ্টা তিনিই

অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক ভিত্তি তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটিও তাঁর ভাবনা থেকেই তৈরি এবং নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়ে দলটি দীর্ঘদিন ধরে তা ব্যবহার করে আসছে।

তাই কেবল বিধায়কের সংখ্যা বা দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রতীকের মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না বলেই মমতার অংশের যুক্তি। তাদের দাবি, দলটির প্রতিষ্ঠা, সাংগঠনিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক সরাসরি যুক্ত। ফলে প্রতীকের ওপর অধিকারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশেরই।

দিল্লির শুনানির দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবির পর নির্বাচন কমিশন এখন তাদের বক্তব্য সরাসরি শুনতে চাইছে। শনিবারের পৃথক শুনানিতে উভয় পক্ষ নিজেদের দাবির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করবে। সর্বোচ্চ পাঁচজন করে প্রতিনিধি নিয়ে অংশ নিতে পারবে দুই পক্ষ।

উপনির্বাচনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরুর আগে কমিশনের সিদ্ধান্ত তাই দুই পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘জোড়াফুল’ প্রতীক কোন অংশ ব্যবহার করতে পারবে, সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে আসন্ন উপনির্বাচনে তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয় ও নির্বাচনী অবস্থানও।

ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই অংশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন এসে ঠেকেছে নির্বাচন কমিশনের দরজায়। শনিবারের শুনানির পর কমিশন কোন পক্ষকে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারের অধিকার দেয়, সেদিকেই এখন নজর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলের।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স