বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আরও জোরদার করতে জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের এই আয়োজনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর পর্বে বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় তাঁর লিখিত জবাব সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এতে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সৃষ্টি মিয়ানমারে এবং এই সংকটের টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। তাই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারে উচ্চপর্যায়ের আয়োজন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর লিখিত জবাবে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বন্ধুরাষ্ট্র, দাতাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরেও রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার কাউন্সিলে প্রস্তাব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জবাবদিহি প্রক্রিয়াতেও বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে সংসদকে জানান তিনি।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সম্ভব নয়। তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে ফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার মধ্যেই এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিহিত।
৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন গত মঙ্গলবার শুরু হয়েছে। এবারের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। এ সময় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগও এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরকে কাজে লাগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
অতীতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বিগত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়নি। এর পরিবর্তে লোকদেখানো তৎপরতার মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। এর ফলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক—সব পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন জোরদারের চেষ্টা চলছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নতুন কমিটি
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সম্প্রতি রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি পৃথক কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আবদুল খালেকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে সরকার আন্তরিক। তবে এ সম্পর্ক অবশ্যই সমমর্যাদার ভিত্তিতে হতে হবে।
সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈধ পথে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়টিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সীমান্তে ‘পুশ ইন’ নিয়ে উদ্বেগ
ভারত থেকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে মানুষকে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ, অর্থাৎ ‘পুশ ইন’ নিয়েও সংসদে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নেওয়াজ হালিমা আরলীর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে কোনো ধরনের পুশ ইন বা এ ধরনের প্রচেষ্টাকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
এ বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
দূতাবাসগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কার্যক্রমে দুর্বলতা ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দূতাবাসগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো যাতে দেশের স্বার্থ, নাগরিকদের অধিকার এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে রেখে এগোতে চাইছে সরকার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন আরও জোরালো করার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ।