জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে সেরা ফলাফল অর্জনকারী ৫৭ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ‘ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিতসহ মোট ৪ হাজার ৯২১ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা এবং শিক্ষাবৃত্তির অর্থ তুলে দেওয়া হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্নাতক (সম্মান), স্নাতক (পাস) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছরে সেরা ফলাফল অর্জনকারী ৩৭টি কলেজের ৫৭ জন শিক্ষার্থীকে এ বছর ‘ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সম্মাননা সনদ ও ক্রেস্টের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এ খাতে মোট ১৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪–২৫ সালের জন্য নির্বাচিত ১ হাজার ৫২৫টি কলেজের ৪ হাজার ৯২১ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও এ বৃত্তির আওতায় রয়েছেন।
দুই বছরে শিক্ষাবৃত্তি প্রায় ৩ কোটি টাকা
অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালের জন্য নির্বাচিত ৮৩০টি কলেজের ২ হাজার ৮৯৭ জন শিক্ষার্থীকে জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। এ খাতে মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জন্য নির্বাচিত ৭২৫টি কলেজের ২ হাজার ২৪ জন শিক্ষার্থীকে জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে মোট ১ কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
দুই বছরে শিক্ষাবৃত্তি হিসেবে মোট ২ কোটি ৯৫ লাখ ২৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলামের ওপর গুরুত্ব শিক্ষামন্ত্রীর
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষার একটি বিশাল অংশের দায়িত্ব পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি অধিভুক্ত কলেজগুলো নিয়মিত পরিদর্শন, শিক্ষার মান যাচাই এবং আয়-ব্যয়ের অডিট নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। কলেজগুলোতে কী ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের কী পড়ানো হচ্ছে এবং বিদ্যমান কারিকুলাম কতটা যুগোপযোগী—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও দক্ষতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্কিল–বেজড বা দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষার্থীরা মেধাবী হলেও যথাযথ দিকনির্দেশনার অভাবে তাঁদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ অনেক সময় ঘটছে না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পরীক্ষাপদ্ধতিতে সংস্কার ও এআই ব্যবহারের আহ্বান
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আদলে দক্ষতা ও মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হলেও শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি মডেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে পরীক্ষাপদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, অনলাইন ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যকর করার তাগিদ
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কার্যকর ব্যবহার জরুরি। তবে বিদ্যুৎ–সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব ক্লাসরুম প্রত্যাশিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।
এ সমস্যা সমাধানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২০২৭ সালের মধ্যে কারিকুলাম সংস্কারের লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন।
এ লক্ষ্যে কারিকুলাম উন্নয়ন এবং দক্ষতাভিত্তিক ও বাজারমুখী কোর্স চালুর কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কারিকুলাম সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখানোর কার্যক্রম ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে দেশি-বিদেশি ১৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
অধিভুক্ত কলেজে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ
দেশের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন উপাচার্য। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে কলেজগুলোয় বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিনা খরচে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার অংশ হিসেবেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান। আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. নাজমুল হোসাইন।
অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। কলেজ মনিটরিং অ্যান্ড ইভাল্যুশন দপ্তরের পরিচালক মো. সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ দপ্তরের পরিচালক সালমা পারভীন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালক, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।