ঢাকা

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বের প্রবণতা নিয়ে জামায়াতের উদ্বেগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক রূপরেখা ঘোষণার পর সরকারের আপত্তির মুখে তা পুনর্বিবেচনার ঘটনায় সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আশঙ্কা, প্রশাসনিক ও অন্যান্য নানা কারণ দেখিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি পরিকল্পিত প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, অনির্বাচিত প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে জনগণের ভোটাধিকার, স্থানীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব আরও পিছিয়ে পড়বে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ইসির রূপরেখা নিয়ে সরকারের আপত্তি

সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে আয়োজনের একটি প্রাথমিক রূপরেখা ঘোষণা করে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের নির্বাচন ১২ নভেম্বর এবং শেষ ধাপের নির্বাচন আগামী ২৭ মে আয়োজনের কথা জানানো হয়েছিল।

তবে রূপরেখা ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রকাশ্যে ওই সময়সূচি নিয়ে আপত্তি জানান বলে উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার।

এরপর নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রূপরেখাটিকে ‘পুরোপুরি প্রাথমিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায়।

গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের আপত্তি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়, তাহলে তা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের ভোটাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে যদি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়, তাহলে জনগণের ভোটের প্রতি আস্থা নষ্ট হবে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

‘নির্বাচন বিলম্বিত করার পরিকল্পিত প্রবণতা’

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, তাঁরা আশঙ্কা করছেন, নানা প্রশাসনিক ও অন্যান্য অজুহাত দেখিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি পরিকল্পিত প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় অনির্বাচিত প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ আরও পিছিয়ে যাবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগও বিলম্বিত হবে বলে মনে করে জামায়াত।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আপত্তি

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মিয়া গোলাম পরওয়ার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের একটি সুপারিশের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইসি একটি সুপারিশ অনুমোদন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তাঁর দাবি, এই সিদ্ধান্ত সংবিধানবিরোধী এবং এতে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহু কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণার উদ্যোগ বৈষম্যমূলক।

‘রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য’ থাকার অভিযোগ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের বর্তমান আচরণের পেছনে ‘রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য’ থাকতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।

তাঁর অভিযোগ, সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিদ্যমান আইন ও নীতিতে পরিবর্তন এনে সরকারদলীয় ব্যক্তিদের নির্বাচনে জয়ী করার জন্য কোনো কৌশল নিচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ‘মাগুরার স্টাইলে’ নির্বাচনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি করে বিরোধী দলকে নির্বাচন বর্জনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন।

তবে এসব বক্তব্য জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অভিযোগ ও আশঙ্কা হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে।

জামায়াতের আট দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আট দফা দাবি তুলে ধরে জামায়াত।

দলটির দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্বাচনের সময়সূচি ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
কোনো মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না।
দ্রুত একটি সুস্পষ্ট, চূড়ান্ত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ ও কার্যকর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ও কার্যকর নিশ্চয়তা দিতে হবে।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বর্তমানে সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রশাসকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণাসংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।

জামায়াতের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করতে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছে দলটি।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ সময় দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স