ঢাকা

কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট থাচির যুদ্ধাপরাধ মামলায় ২৫ বছরের সাজা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচিকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্স (কেএসসি)। ১৯৯৮-৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধের সময় নির্যাতন, বেআইনি আটক ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার কেএসসিতে এ রায় ঘোষণা করা হয়। বিচারক চার্লস স্মিথ রায় পড়ার সময় ৫৮ বছর বয়সী থাচিকে আদালতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৯৮-৯৯ সালের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময় কসোভো লিবারেশন আর্মির (কেএলএ) শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অংশ হিসেবে থাচি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সার্বীয় বাহিনীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, বেআইনি আটক ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

৯৬ জনের হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত

আদালতের দেওয়া রায় অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে কেএলএ বাহিনীর হাতে অন্তত ৯৬ জন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বেসামরিক নাগরিক হত্যার ঘটনায় থাচিকে দায়ী করা হয়েছে।

কেএলএর নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা এবং সংঘাতের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রসিকিউশন পক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও ছয়টি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে না পারায় থাচিসহ আসামিদের ওই অভিযোগগুলো থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে দণ্ডপ্রাপ্তদের।

কেএলএর আরও তিন নেতার সাজা

একই মামলায় থাচির পাশাপাশি কসোভো লিবারেশন আর্মির আরও তিন শীর্ষ নেতাকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কেএলএর সাবেক অধিনায়ক ইয়াকুপ ক্রাসনিকিকে ২৫ বছর, কাদ্রি ভেসেলিকে ১৮ বছর এবং রেঝেপ সেলিমিকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্যাতন, আটক এবং হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

আদালত কিছু অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করলেও প্রমাণের ঘাটতির কারণে অন্য ছয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে তাঁদের খালাস দিয়েছে।

প্রিস্টিনায় বিক্ষোভ

থাচির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ আলবেনীয় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ থাচি এবং কেএলএকে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে কসোভোর স্বাধীনতাসংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব হিসেবে দেখে।

রায়ের প্রতিবাদে প্রিস্টিনার রাস্তায় হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁরা হেগের আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান করে থাচির পক্ষে অবস্থান নেন।

কসোভোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্লাউক কোনজুফকা রায়টিকে ‘ভয়াবহ এবং কসোভোর জন্য চরম ক্ষতিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন।

আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামাও রায়ের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেগের একটি ছবির পাশে আলবেনীয় শব্দ ‘মারে’—অর্থাৎ ‘লজ্জা’—লিখে তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান।

সার্বিয়ার স্বাগত

অন্যদিকে থাচি ও কেএলএর বিরুদ্ধে আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে সার্বিয়া।

সার্বিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ইভিকা দাচিচ বলেন, এই রায় প্রমাণ করে যে কেএলএ একটি অপরাধী সংগঠন ছিল। তাঁর ভাষ্য, নিহত সার্বীয়দের গণকবরের ওপর কোনো দেশ গড়ে উঠতে পারে না।

কসোভো যুদ্ধের সময় কেএলএ ও সার্বীয় বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘাত হয়। ওই সংঘাতের পর ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে কসোভো সার্বিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

থাচির রাজনৈতিক উত্থান ও হেগে আত্মসমর্পণ

কসোভোর স্বাধীনতার পর দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হাশিম থাচি। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন।

কসোভো যুদ্ধের সময় কেএলএর রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি কসোভোর অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

২০২০ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর তিনি প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং হেগে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি এগিয়ে যায়।

হাশিম থাচি অবশ্য পুরো বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বুধবারের রায়ের পরও তাঁর বিরুদ্ধে নির্ধারিত কিছু অভিযোগে দণ্ড বহাল থাকলেও প্রমাণিত না হওয়া অভিযোগগুলো থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এখন রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে তাঁর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স