কলকাতায় এ বছর দুর্গাপূজার প্রতিমার অর্ডার কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে থিমভিত্তিক প্রতিমার চাহিদায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে বলে জানিয়েছেন উত্তর কলকাতার কুমারটুলির মৃৎশিল্পীরা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায়, গত কয়েক বছরে গণেশপূজার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মৃৎশিল্পীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কুমারটুলিতে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা সামান্য কমেছে। তবে শিল্পীদের মতে, আগের বছরগুলোর মতো বরাত বাড়েনি—এটাই এবারের বড় পরিবর্তন।
কুমারটুলি মৃৎশিল্পী সমিতির সম্পাদক বাবু পাল বলেন, দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার কিছুটা কমলেও এটিকে বড় ধরনের পতন বলা যাবে না। তবে থিমপূজার জন্য যে ধরনের প্রতিমার অর্ডার নিয়মিত আসত, এবার তা প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক পূজা কমিটি থিমের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী একচালা প্রতিমার দিকে ফিরেছে।
‘থিমপূজা’ বলতে সাধারণত কোনো বিখ্যাত শিল্পকর্ম, স্থাপত্য বা নির্দিষ্ট শিল্পভাবনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ নির্মাণকে বোঝানো হয়।
বাড়ছে গণেশপূজা
দুর্গাপূজার চাহিদায় কিছুটা ভাটা দেখা দিলেও পশ্চিমবঙ্গে গণেশপূজার বিস্তার চোখে পড়ার মতো। পূজার উদ্যোক্তা ও প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর রাজ্যে প্রায় ৩০০টি গণেশপূজা হয়েছিল। এবার শুধু কলকাতাতেই সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮০০ হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
এসব পূজার একটি বড় অংশের উদ্যোক্তা পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অবাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ। উত্তর ও পশ্চিম ভারতে গণেশপূজা দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসব হলেও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বিস্তার নতুন মাত্রা পেয়েছে।
পূজার উদ্যোক্তাদের একাংশ এই বৃদ্ধির সঙ্গে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও সম্পর্ক দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে গণেশপূজার মতো উত্তর ও পশ্চিম ভারতের সাংস্কৃতিক পরিসরে বেশি প্রচলিত ধর্মীয় আয়োজনও পশ্চিমবঙ্গে দৃশ্যমানতা পেয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যাকে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য হিসেবে দেখা জরুরি। গণেশপূজা বৃদ্ধির পেছনে অভিবাসী ও অবাঙালি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রভাব, নগরায়ণ, বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের কলকাতায় বসতি এবং ধর্মীয় উৎসবের বিস্তারের মতো সামাজিক কারণও রয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট দেব-দেবীর পূজার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা যেমন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসব, তেমনি মহারাষ্ট্রসহ ভারতের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গণেশপূজার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য।
রাজনীতির সঙ্গে গণেশপূজার যোগসূত্রের দাবি
গণেশপূজাকে রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বিজেপির ঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র ‘যুগশঙ্খ’। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণেশপূজার মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বিজেপি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যসহ দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন গণেশপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। রোববার তিনি কলকাতার জ্যোতিনগর বন্ধু মহল ক্লাব ও লেক টাউন স্পোর্টিং ক্লাবসহ বিভিন্ন পূজার উদ্বোধন করেন।
গণেশপূজায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি শমীক ভট্টাচার্য ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত বিতর্কিত ব্যক্তি গোপাল মুখোপাধ্যায়ের একটি মূর্তিও উদ্বোধন করেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সমালোচকদের কেউ কেউ গণেশপূজার সাম্প্রতিক বিস্তারকে শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও পরিবর্তনের একটি দিক হিসেবে দেখছেন। তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে।
কেন কমছে থিমপূজা
কুমারটুলির মৃৎশিল্পীদের মতে, দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার কমার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে থিমপূজায়। সমিতির কর্মকর্তাদের হিসাবে, গত বছর যেখানে প্রায় ১৫০টি থিমপূজার প্রতিমা তৈরির কাজ হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১২টির মতো।
শিল্পীদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এবার কাজের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেকটা অনিশ্চিত। শেষ মুহূর্তে থিমপূজার অর্ডার বাতিল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এ ছাড়া প্রতিমার উচ্চতা নিয়েও বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছেন শিল্পীরা। তাঁদের দাবি, কুমারটুলিতে এবার প্রতিমার উচ্চতা সর্বোচ্চ ১১ ফুট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এটিকে বিসর্জনের সময় বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য দেওয়া পুরোনো নির্দেশনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
শিল্পীদের একাংশের মতে, এর ফলে বড় আকারের প্রতিমা তৈরির সুযোগ কমেছে। পাশাপাশি থিম বা অতিরিক্ত শৈল্পিক বৈচিত্র্যের বদলে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমার দিকে ঝুঁকছেন অনেক পূজা উদ্যোক্তা।
তবে এসব দাবির সবকটির বিষয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
মাটির সংকটেও বিপাকে মৃৎশিল্পীরা
প্রতিমা তৈরির প্রধান উপকরণ মাটির সংকটও কুমারটুলির শিল্পীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। শিল্পীদের দাবি, অবৈধ বালি ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ায় প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত বেলে মাটির সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।
এর সঙ্গে পূজার বাজেট কমে যাওয়া ও সরকারি অনুদান নিয়ে অনিশ্চয়তাও যুক্ত হয়েছে বলে শিল্পীদের বক্তব্য। ফলে অনেক পূজা কমিটিকে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রতিমা, মণ্ডপ ও অন্যান্য আয়োজনের ওপর।
শিল্পীদের হিসাবে, কুমারটুলিতে দেড় শতাধিক স্টুডিও রয়েছে এবং পুরো এলাকার প্রতিমা-নির্ভর অর্থনীতির বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। ফলে প্রতিমার অর্ডার কমে গেলে তার প্রভাব শুধু শিল্পীদের ওপর নয়, পরিবহন, মাটি সরবরাহ, রং, বাঁশ, কাপড় ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষের ওপরও পড়ে।
ইতিমধ্যে কলকাতার একাধিক নতুন ও পুরোনো পূজা সংগঠন এবার দুর্গাপূজা না করার ঘোষণা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী প্রতিমায় ফেরার প্রবণতা
বাবু পালের ভাষ্য অনুযায়ী, থিমপূজার অর্ডার কমলেও পূজার আয়োজন পুরোপুরি কমে গেছে—এমনটা বলা যাবে না। বরং অনেক উদ্যোক্তা আগের দিনের একচালা দুর্গাপ্রতিমার দিকে ফিরছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে খরচ কমানো, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, থিমপূজার অনিশ্চয়তা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিমার প্রতি নতুন করে আগ্রহ—সবকিছুর ভূমিকা থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ফলে কলকাতার দুর্গাপূজায় এবার একদিকে যেমন আয়োজনের ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিমা তৈরির বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে।
দুর্গাপূজা বনাম গণেশপূজা: বদলাচ্ছে সাংস্কৃতিক পরিসর?
পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এই পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একসময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতির পার্থক্য তুলে ধরে উত্তর ভারতের সঙ্গে রামের এবং পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা বলেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে গণেশপূজার বিস্তার সেই প্রচলিত সাংস্কৃতিক বিভাজনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। তবে একটি বা একাধিক বছরের পূজার সংখ্যা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
গণেশপূজার বিস্তার যেমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তেমনি কলকাতার জনসংখ্যার বৈচিত্র্য, অন্যান্য রাজ্য থেকে মানুষের আগমন এবং নতুন ধরনের ধর্মীয় আয়োজনের জনপ্রিয়তাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে আবার বাড়ছে দুর্গাপূজা
কলকাতার এই চিত্রের বিপরীতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে দুর্গাপূজার সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৩১ হাজার ৪৬১টি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৩৫৫টিতে—অর্থাৎ এক বছরে ১ হাজার ৮৯৪টি পূজা বেড়েছে।
একই সময়ে কলকাতায় দুর্গাপূজার প্রতিমার অর্ডার ও থিমপূজার বাজারে কিছুটা মন্দা দেখা দিয়েছে। দুই বাংলার এই বিপরীত প্রবণতা তাই ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও একটি তুলনামূলক চিত্র সামনে আনছে।
তবে কলকাতায় দুর্গাপূজা কমার মাত্রা এবং গণেশপূজা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বুঝতে আরও কয়েক বছরের তথ্য প্রয়োজন। এ বছরের পরিসংখ্যান মূলত একটি পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।