বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে অনলাইন লাইভ মেন্টর (ওএলএম) প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার নির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা অধ্যায় বুঝতে সমস্যা হলে ঘরে বসেই প্রয়োজনের সময়ে উপযুক্ত মেন্টরের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে এ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) থেকে শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের এডটেক প্রতিষ্ঠান ননএকাডেমির উদ্যোগে চালু হওয়া ওএলএম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একাদশ শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা অনলাইনে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী মেন্টর নির্বাচন করে সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ পাবেন। প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সহায়তার ঘাটতি দূর করা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগ সহজ করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ননএকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এ আই আরিফ জানান, শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পুরো একটি বিষয় নয়, বরং নির্দিষ্ট একটি অধ্যায় বা ছোট কোনো অংশ বুঝতে সমস্যায় পড়েন। কিন্তু সেই মুহূর্তে শিক্ষক বা টিউশন শিক্ষকের সহায়তা পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতা থেকেই প্রয়োজনের সময়ে শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত মেন্টরের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা থেকে ওএলএম প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট বিষয় বা অধ্যায় অনুযায়ী মেন্টর খোঁজার সুযোগ
ওএলএম প্ল্যাটফর্মে কোনো বিষয়ে সমস্যায় পড়লে শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিষয় বা অধ্যায়ের নাম দিয়ে মেন্টর খুঁজতে পারবেন। অনুসন্ধানের পর ওই বিষয়ে যুক্ত মেন্টরদের তালিকা দেখা যাবে। পাশাপাশি কোন মেন্টর তখন অনলাইনে আছেন, তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচিতি এবং প্রতি ঘণ্টায় পারিশ্রমিকের তথ্যও দেখা যাবে।
এরপর শিক্ষার্থী নিজের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী একজন মেন্টর নির্বাচন করে তাঁর কাছে ক্লাসের অনুরোধ পাঠাতে পারবেন। মেন্টর সেই অনুরোধ গ্রহণ করলে নির্ধারিত পারিশ্রমিক পরিশোধের পর শিক্ষার্থী সরাসরি অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হতে পারবেন।
প্ল্যাটফর্মটিতে অনলাইন ক্লাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ক্লাস রেকর্ডিং এবং ডিজিটাল হোয়াইটবোর্ডের মতো সুবিধাও রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী শুধু মেন্টরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগই পাবেন না, বরং বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষণ-উপকরণও ব্যবহার করতে পারবেন।
শুরুতে একাদশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা
প্রাথমিক পর্যায়ে একাদশ শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ওএলএমের সেবা চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী মেন্টরের সহায়তা নিতে পারবেন।
পরবর্তী সময়ে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও এ প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
এ আই আরিফ বলেন, শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে অনেক সময় বড় কোনো কোর্স বা দীর্ঘমেয়াদি টিউশনের প্রয়োজন হয় না। বরং নির্দিষ্ট কোনো ধারণা, অধ্যায় বা সমস্যার সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে জানা দরকার হয়। ওএলএম সেই প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হতে পারবেন মেন্টর
ওএলএম শুধু শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ তৈরি করছে না, পড়াশোনার পাশাপাশি যাঁরা পড়াতে চান, তাঁদের জন্যও একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এখানে মেন্টর হিসেবে যুক্ত হতে পারবেন।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এবং বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী মেন্টর হিসেবে যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
এসব মেন্টর তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, কোন কোন বিষয়ে পড়াতে পারেন এবং প্রতি ঘণ্টায় কী পরিমাণ পারিশ্রমিক নেবেন—এসব তথ্য দিয়ে নিজেদের প্রোফাইল তৈরি করেছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা মেন্টরের প্রোফাইল দেখে তাঁর যোগ্যতা ও পড়ানোর বিষয় সম্পর্কে ধারণা নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচন করতে পারবেন।
উদ্যোক্তাদের মতে, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়াশোনার সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনলাইনে টিউশন করানোর সুযোগ পাবেন। প্রচলিত টিউশনের মতো শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় যাতায়াত করার প্রয়োজন না থাকায় সময়ের আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে।
টিউশনের যাতায়াতের সময় কমানোর ভাবনা
ওএলএম চালুর পেছনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ আই আরিফ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি দেখেছেন, অনেক শিক্ষার্থী টিউশন করাতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করেন। এক ঘণ্টার ক্লাস নিতে গেলেও যাতায়াতসহ তাঁদের প্রায় তিন ঘণ্টা সময় চলে যায়। এতে সময়ের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক চাপও তৈরি হয়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইনভিত্তিক মেন্টরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সময়ের একটি বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। একজন মেন্টর নিজের সুবিধাজনক সময়ে বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও বাসা থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী মেন্টরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
রাতেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ
ওএলএম তৈরির পেছনে নিজের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন এ আই আরিফ। তাঁর ভাষ্য, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় অনেক ক্ষেত্রে কোনো একটি অধ্যায়ের নির্দিষ্ট বিষয় বুঝতে সমস্যা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
বিশেষ করে রাতে পড়াশোনা করার সময় কোনো বিষয় আটকে গেলে শিক্ষক বা টিউশন শিক্ষকের কাছে সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা নেওয়া সম্ভব হতো না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটে বিভিন্নভাবে খোঁজ করেও নির্দিষ্ট সমস্যার সহজ ও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাওয়া কঠিন হতো।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষার্থী যখন যে বিষয়ে সমস্যায় পড়বেন, তখন সেই বিষয়ে দক্ষ একজন মেন্টরের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার চিন্তা আসে বলে জানান তিনি।
শেখা ও শেখানোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ
ওএলএমের মূল ধারণা হলো শিক্ষার্থীর প্রয়োজন এবং মেন্টরের দক্ষতাকে একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা। কোনো শিক্ষার্থীর যখন নির্দিষ্ট বিষয়ে সহায়তা প্রয়োজন হবে, তখন তিনি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ মেন্টর খুঁজে নিতে পারবেন। অন্যদিকে মেন্টর নিজের সময়, দক্ষতা ও পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীকে সহায়তা করতে পারবেন।
এ আই আরিফ বলেন, শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে অনেক সময় পুরো বিষয়টি নয়, বরং নির্দিষ্ট একটি অংশ বুঝতে সমস্যা হয়। সেই প্রয়োজন অনুযায়ী মেন্টর খুঁজে নিয়ে সরাসরি তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই ওএলএমের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে পড়াশোনার পাশাপাশি যাঁরা পড়াতে চান, তাঁরাও নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন।
কীভাবে ব্যবহার করবেন
শিক্ষার্থীকে প্রথমে ওএলএমের ওয়েবসাইট olm.bd-এ গিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় বিষয় বা অধ্যায়ের ভিত্তিতে মেন্টর খুঁজে নিতে পারবেন। তালিকায় থাকা মেন্টরদের প্রোফাইল, প্রাপ্যতা ও পারিশ্রমিক দেখে পছন্দের মেন্টরের কাছে ক্লাসের অনুরোধ পাঠানো যাবে।
মেন্টর অনুরোধ গ্রহণ করার পর নির্ধারিত পারিশ্রমিক পরিশোধ করে অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়া যাবে। ক্লাসের সময় মেন্টর ও শিক্ষার্থী সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হোয়াইটবোর্ডসহ অন্যান্য সুবিধা ব্যবহার করা যাবে। ক্লাস রেকর্ডিংয়ের সুবিধা থাকায় পরবর্তী সময়ে শেখা বিষয়টি আবার দেখার সুযোগও থাকবে।
উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নমনীয়ভাবে টিউশনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক বা মেন্টর খোঁজা এবং টিউশনের জন্য দীর্ঘ সময় যাতায়াতের মতো প্রচলিত কিছু ভোগান্তিও কমানো সম্ভব হবে।
এভাবে একজন শিক্ষার্থী তাঁর প্রয়োজনের সময়ে উপযুক্ত মেন্টরের কাছে পৌঁছাতে পারবেন এবং একজন মেন্টর নিজের সময় ও দক্ষতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারবেন—শেখা ও শেখানোর এই দুই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, নমনীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর করাই ওএলএম প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য।