ঢাকা

সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক বর্জন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের, মাঝপথে বেরিয়ে গেল প্রতিনিধিরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ঢাকা

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার প্রতিবাদ জানিয়ে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা মাঝপথে বর্জন করেছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। রোববার জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিটির মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার পর দলটির দুই প্রতিনিধি বেরিয়ে যান।

রোববার বেলা আড়াইটার দিকে সভাটি শুরু হয়। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিদের এ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে বিরোধী দলগুলোর বড় অংশ সভায় অংশ নেয়নি। সভায় অংশ নিয়ে পরে ওয়াকআউট করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি

সভা থেকে বেরিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তাঁরা বিশেষ কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান প্রক্রিয়ার পার্থক্য থাকায় তাঁরা প্রতিবাদ জানিয়ে সভা থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

হাসনাত কাইয়ুমের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা রয়েছে। সেই পরিষদ গঠন না করে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় তাঁদের আপত্তি রয়েছে।

তিনি বলেন, বাস্তবায়ন আদেশে ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল এবং সেই সময়সীমা এখনো রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আপত্তি সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। দলটির বক্তব্য, জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কারের যে কাঠামো ও প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়েছে, তা অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

যে কারণে মতবিনিময়ের আয়োজন

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির এটি ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের প্রথম পর্ব। কমিটির আলোচ্যসূচিতে ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কমিটির মতবিনিময়’।

এর আগে বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী দল ও জোটগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের দুজন করে প্রতিনিধিকে সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।

গত ৪ আগস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে রাজনৈতিক দল, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় রোববার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বিরোধী দলগুলোর বড় অংশের অনুপস্থিতি

তবে মতবিনিময় সভায় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে শুরু থেকেই বিভাজন দেখা যায়। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ সভায় অংশ নেয়নি। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি।

বিরোধী দলগুলোর অবস্থান হলো, গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সেই পরিষদ গঠন না করে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে গণভোটের মাধ্যমে পাওয়া ম্যান্ডেটের কাঠামো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে না।

এ কারণে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতেও বিরোধী দলগুলোর কোনো প্রতিনিধি নেই। সংসদে প্রতিনিধিত্ব নেই—এমন কয়েকটি দলও একই কারণে সংবিধান সংশোধনের বর্তমান প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে না।

কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়ে যারা ছিলেন

বিরোধী দলগুলোর বয়কটের মধ্যেও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা রোববারের মতবিনিময়ে অংশ নেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানসহ গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, এনডিএম, আমজনতার দল, ইসলামী ঐক্যজোট, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণফোরাম ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দুই প্রতিনিধি শুরুতে সভায় উপস্থিত হলেও পরে প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে যান। ফলে দলটির অবস্থানও পুরোপুরি বর্জন না করে ‘অংশ নিয়ে ওয়াকআউট’ হিসেবে সামনে আসে।

১৮০ দিনের সময়সীমার প্রসঙ্গ

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে নির্ধারিত সময়সীমা ও বাস্তবায়ন কাঠামো। হাসনাত কাইয়ুমের ভাষ্য অনুযায়ী, আদেশে ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। সেই সময়সীমা এখনো বিদ্যমান থাকায় আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে দলটি।

দলটির দাবি, সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে একটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিষদ গঠন করা হোক। এ বিষয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আগেও অবস্থান জানিয়েছে বলে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য

এদিকে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন দিতে চায়। রোববারের মতবিনিময় সভার আগে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সাবেক বিচারক, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শহীদ পরিবারের সদস্য, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এসব মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনার পর প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধনের আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। কমিটির এ সময়সূচির সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনসহ বিরোধী দলগুলোর প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদভিত্তিক প্রক্রিয়ার পার্থক্যই এখন রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।

মতপার্থক্যের কেন্দ্রে বাস্তবায়ন পদ্ধতি

সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মূল মতপার্থক্য এখন সংস্কারের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি ঘিরেও। বিশেষ কমিটি সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মতামত নিয়ে সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদে নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানাচ্ছে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের ওয়াকআউট এই মতপার্থক্যকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুতের লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা কতটা বিস্তৃত হয় এবং ভিন্নমতের দলগুলোকে কীভাবে যুক্ত করা যায়—সেটিও পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স