ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে
নিউইয়র্ক
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তাঁর সরকারি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ না-ও করতে পারে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনথের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে উদ্বেগ এবং নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুকে বহনকারী ‘উইং অব জিয়ন’ উড়োজাহাজটি জেএফকের পরিবর্তে নিউজার্সির কোনো সামরিক ঘাঁটি অথবা নিউআর্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নিতে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম সময় অবস্থান করবেন এবং সেখানে রাতযাপন না করেই ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে নিরাপত্তা ও বিক্ষোভের আশঙ্কাও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং মামদানির প্রকাশ্য অবস্থান। তবে নিউইয়র্কের মেয়র নিজেই পরে বলেছেন, আইসিসির ওই পরোয়ানা কার্যকর করে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার স্বাধীন আইনি ক্ষমতা নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষের নেই।
কেন জেএফকে এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা
ইয়েদিওথ আহরোনথের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ জেএফকে বিমানবন্দরে নামলে সেটি সেখানে কতক্ষণ অবস্থান করবে এবং বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটির ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে—এ নিয়ে নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর প্রবেশকে কেন্দ্র করে মেয়র মামদানির প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আইনি বিরোধ তৈরি হতে পারে। এ কারণে উড়োজাহাজটি শহরের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে না নামিয়ে নিউজার্সিতে অবতরণের বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
ব্রিটিশভিত্তিক মিডল ইস্ট মনিটরও ইয়েদিওথ আহরোনথের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নিউজার্সির সামরিক ঘাঁটি কিংবা নিউআর্ক বিমানবন্দরকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর সফর সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য বিক্ষোভের বিষয়টিও রয়েছে।
মামদানির সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিরোধ
নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফর ঘিরে মামদানির অবস্থান আগেই আলোচনায় এসেছে। নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের প্রচারের সময় এবং পরে তিনি বলেছিলেন, আইসিসির পরোয়ানা অনুযায়ী নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
জুলাইয়ে মামদানি জানিয়েছিলেন, নেতানিয়াহু সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে এলে তাঁকে আটক করার বিষয়ে তাঁর প্রশাসন আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করছে। পরে আইনি পর্যালোচনার পর তিনি স্পষ্ট করেন, নিউইয়র্ক সিটির নিজস্বভাবে ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষমতা নেই। তবে তিনি মার্কিন ফেডারেল সরকারের প্রতি আইসিসির পরোয়ানা কার্যকরের আহ্বান জানান।
অর্থাৎ নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ জেএফকে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি সরাসরি মামদানি তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন—এমন আইনি বাস্তবতার ওপর নির্ভর করছে না। বরং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং সফর ঘিরে প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়গুলো।
আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গাজা যুদ্ধের সময় কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে এই পরোয়ানা সম্পর্কিত। ইসরায়েল আইসিসির এখতিয়ার স্বীকার করে না এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও আইসিসির সদস্য নয়।
এই আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে আইসিসির পরোয়ানা কার্যকরের প্রশ্নটি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সফরকালে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা হবে না।
ফলে নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ফেডারেল অবস্থান তার বিপরীত।
নিউইয়র্কে অবস্থানও হবে সংক্ষিপ্ত
নেতানিয়াহুর এবারের সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নিউইয়র্কে তাঁর অবস্থানের সময় কমিয়ে আনা। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার পরিকল্পনা করেছেন। নিউইয়র্কে রাতযাপন না করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় নেতানিয়াহুর টেক্সাসে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের সঙ্গে বৈঠকের একটি পরিকল্পনাও বাতিল হয়েছে বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে নিরাপত্তা, সময়সূচি ও বিমান অবতরণের ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন বিষয় সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের মঞ্চে মুখোমুখি ভিন্ন বার্তা
নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে তিনি ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং সমালোচনার জবাব দেবেন।
অন্যদিকে মামদানি গাজা যুদ্ধ এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির পরোয়ানা নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে নিউইয়র্ক সিটি যে ওই পরোয়ানা নিজস্বভাবে কার্যকর করতে পারবে না, সে বিষয়টি তাঁর প্রশাসনের আইনি পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়েছে।
এ কারণে এবারের সফরে নেতানিয়াহুর জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ, তেমনি নিউইয়র্কে তাঁর যাতায়াত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সফর ঘিরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চাপ
নেতানিয়াহুর সফরকে ঘিরে নিউইয়র্কে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সম্ভাবনাও রয়েছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী এবং ইসরায়েলপন্থী—দুই পক্ষেরই বিভিন্ন কর্মসূচি হয়ে থাকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে জড়ো হওয়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থাও সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর থাকে।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর উড়োজাহাজ কোথায় অবতরণ করবে, তিনি কতক্ষণ নিউইয়র্কে থাকবেন এবং কীভাবে তাঁর চলাচল পরিচালিত হবে—এসব বিষয় নিয়ে আগেভাগেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর এবারের নিউইয়র্ক সফর শুরু হওয়ার আগেই তাঁর যাতায়াত নিয়ে অস্বাভাবিক সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। জেএফকে বিমানবন্দর এড়িয়ে নিউজার্সিতে অবতরণের সম্ভাবনা, নিউইয়র্কে অবস্থান সংক্ষিপ্ত করা এবং রাতযাপন না করার পরিকল্পনা—সবকিছুই সফরটিকে ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে মামদানির পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে অতীতের রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলেও নিউইয়র্ক সিটির নিজস্ব আইনি ক্ষমতা নিয়ে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান এখন স্পষ্ট—শহর কর্তৃপক্ষের হাতে আইসিসির পরোয়ানা স্বাধীনভাবে কার্যকর করার ক্ষমতা নেই। ফলে নেতানিয়াহুর এবারের সফরে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে গ্রেপ্তার নয়, বরং নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের অবস্থানের মধ্যে কীভাবে সফরটি পরিচালিত হবে।