ঢাকা

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি, আবারও যন্তর মন্তরের হুঁশিয়ারি সিজেপির

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
নয়াদিল্লি

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির জাতীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করা হবে। পরে দিল্লিতে আবারও ‘যন্তর মন্তর ২.০’ ধরনের কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সিজেপির সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম, বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দলটি একই সঙ্গে এসআইআর স্থগিত, আসন্ন নির্বাচনগুলো আপাতত বন্ধ রাখা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছে।

সিজেপির এই অবস্থানের পেছনে মূলত গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আদেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির বিষয়গুলোর মধ্যে ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন ও বাদ দেওয়া, নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম পরিবর্তন, ভোটার তথ্য ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার এবং এসআইআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ছিল।

১০ মাসে ১৪ বার আপত্তির দাবি

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, সান্ধু ও যোশি অভিযোগ করেছিলেন—কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের জ্ঞাতসারে বা অনুমোদন ছাড়া নেওয়া হয়েছে। একটি ক্ষেত্রে ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন আনার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়েও দুই নির্বাচন কমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

এ ছাড়া ভোটার তালিকার তথ্য ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তিগত কাঠামো নিয়ে দুই কমিশনার আলাদাভাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছেও বিষয়টি তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের আপত্তির কিছু বিষয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছেও পাঠানো হয়েছিল।

তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন পাল্টা অবস্থান জানায়। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআরসহ কমিশনের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিন কমিশনারের অনুমোদনেই সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। কমিশন আরও বলেছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বিভিন্ন সদস্যের ভিন্নমত বা পর্যবেক্ষণ জানানো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ফলে একদিকে দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, এসব ভিন্নমত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক বিভাজনের প্রমাণ নয়।

সিজেপির তিন দাবি

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি তাদের দাবিগুলোও স্পষ্ট করেছে। দলের প্রথম দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করতে হবে। দলটির নেতারা জানতে চান, নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কোনো নির্দেশনা ছিল কি না এবং থাকলে তার উৎস কী।

দ্বিতীয় দাবিতে সিজেপি এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনগুলো আপাতত বন্ধ রাখার কথা বলেছে। দলটি এসআইআরের আগে থাকা ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবিও জানিয়েছে। একই সঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি করেছে।

তৃতীয় দাবিতে ২০২৩ সালের সেই আইন পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যার আওতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিজেপির বক্তব্য, নতুন আইনে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত ও নিরপেক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত।

অভিজিৎ দিপকে বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে প্রথমে দেশজুড়ে আন্দোলন এবং পরে দিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচি দেওয়া হবে। তিনি আগের যন্তর মন্তর আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।

রাহুল গান্ধীরও পদত্যাগ দাবি

এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তোলেন এবং তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন।

রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের কেন্দ্রেও ছিল ‘ভোট চুরি’ অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, ভোটার তালিকা ও নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে তুলে আসছে, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের লিখিত আপত্তির বিষয়টি সেগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

রাহুলের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে। তিনি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি জানান। এসব বক্তব্য অবশ্য রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অভিযোগ; এর সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

রাহুল আরও বলেন, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব কেবল নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে সংসদ, আইন প্রণয়ন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা ও আস্থার প্রশ্নও জড়িত।

বিরোধের কেন্দ্রে এসআইআর

বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভেতরেই দুই কমিশনার বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ছিল ভোটারদের নাম সংযোজন ও বাদ দেওয়া, ভোটার তালিকা পুনর্বহাল, ভোটার নিবন্ধনের ফর্মে পরিবর্তন এবং ভোটার তথ্য ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তিগত কাঠামো।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, এসআইআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনারদের আপত্তির কিছু অংশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, এসআইআরসহ তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মত ছিল। কমিশনের এই বক্তব্যের ফলে বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে—দুই কমিশনারের লিখিত আপত্তিগুলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কীভাবে বিবেচিত হয়েছিল এবং সেগুলোর পরিণতি কী হয়েছিল।

রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ নতুন মাত্রা পেয়েছে। কংগ্রেসের পাশাপাশি সিজেপিও তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছে। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হলো, কমিশনের ভেতরে মতামত বা পর্যবেক্ষণে পার্থক্য থাকা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে। ফলে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সিজেপির ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা এবং দেশজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সময়ে কংগ্রেসও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জোরালো করেছে। এখন এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তি, কমিশনের ব্যাখ্যা এবং বিরোধীদের অভিযোগ—এই তিনটি বিষয়ই ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স